শুক্রবার, ২২ মে, ২০১৫

শা’বান মাসের ফযীলত


মোহাম্মদ নজমুল হুদা খান

শা’বান এক মহিমান্বিত ও বরকতময় মাস। বছরের অন্যান্য মাসের উপর এ মাসের রয়েছে বিশেষ মর্যাদা ও শ্রেষ্ঠত্ব। হাদীস শরীফে আছে যে, প্রত্যেক বছর শা’বান মাসে মানুষের আমল আল্লাহর দরবারে পেশ করা হয়।
হযরত আনাস ইবনে মালিক (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসূলে পাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেছেন, রজব মাসের শ্রেষ্ঠত্ব অন্যান্য মাসের উপর এমন, যেমন আল কুরআনুল কারীমের শ্রেষ্ঠত্ব অন্যান্য আসমানী গ্রন্থের উপর। আর শা’বান মাসের ফযীলত অন্যান্য মাসের উপর এমন, যেমন আমার মর্যাদা অন্যান্য নবীগণের উপর। আর রামাদানের ফযীলত অন্যান্য মাসের উপর এমন, যেমন আল্লাহর শ্রেষ্ঠত্ব সকল সৃষ্টির উপর। (হযরত আবদুল কাদীর জিলানী (র.), গুনিয়াতুত তালিবীন, পৃষ্ঠা ২৪৬)
হযরত জুন্নুন মিসরী (র.) বলেন, রজব হচ্ছে মন্দ কাজ পরিত্যাগের মাস, শা’বান হচ্ছে ইবাদত করার মাস এবং রামাদান হচ্ছে অলৌকিক দৃশ্য দর্শনের মাস। সুতরাং যে ব্যক্তি মন্দ কাজ পরিত্যাগ করে না, আনুগত্যের পথ অবলম্বন করে না এবং অলৌকিকতা দর্শনের অপেক্ষায় থাকে না, সে অনর্থক কর্মসম্পাদনকারীদের পর্যায়ভূক্ত। তিনি আরও বলেন, রজব মাসে শস্য বপন করা হয়, শা’বান মাসে ক্ষেতে পানি সেচ করা হয় এবং রামাদান মাসে ফসল কর্তন করা হয়। সুতরাং কর্তনকারী ঐ বস্তুই কর্তন করে, যা সে বপন করে থাকে। এজন্য মানুষ যা কিছু করে থাকে, তারই প্রতিফল পায়। যে ব্যক্তি নিজের ক্ষেত বিনষ্ট করে, সে ফসল কর্তনের সময় লজ্জিত হয় এবং এর পরিণতিও খারাপ হয়। (গুনিয়াতুত তালিবীন, পৃষ্ঠা ২৩৫)

রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর মাস শা’বান
শা’বান মাসের অত্যধিক ফযীলতের কারণে রাসূলে পাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এ মাসকে তাঁর নিজের মাস বলে অভিহিত করেছেন। হযরত আয়িশা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসূলে পাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেছেন-রামাদান আল্লাহর মাস এবং শা’বান আমার মাস। শা’বান পবিত্রতা দানকারী আর রামাদান গুনাহমোচনকারী। (কানযুল উম্মাল, খ- ৮, পৃষ্ঠা ৭৪৭, হাদীস নং-২৩৬৮৫, ইবনে আসাকির, দায়লামী, আল জামিউস সগীর লিস সুয়ূতী)
শা’বান রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর মাস হওয়ার কারণ হলো তিনি এ মাসে আবশ্যকতা ছাড়া অর্থাৎ নফল হিসেবে অধিক রোযা রাখতেন। আর রামাদান আল্লাহর মাস হওয়ার কারণ হলো আল্লাহ তা‘আলা এ মাসে রোযা রাখা ফরয করে দিয়েছেন। ফলে এ মাসে রোযা রাখা বান্দার প্রতি আল্লাহর হক হিসেবে পরিগণিত। (ফায়যুল কাদীর লিল মানাভী, খ--১৪, পৃষ্ঠা ৪০৫)

শা’বান মাসে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম অধিক পরিমাণে রোযা রাখতেন
শা’বান মাসে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম অধিক পরিমাণে রোযা রাখতেন। হাদীস শরীফে আছে- হযরত আবূ সালামা (রা.) থেকে বর্ণিত, হযরত আয়িশা (রা.) তাঁকে বর্ণনা করেছেন, আয়িশা (রা.) বলেন, নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম শা’বানের চেয়ে অধিক রোযা অন্য কোনো মাসে রাখতেন না। তিনি পূরো শা’বানই রোযা রাখতেন। আর তিনি বলতেন, তোমরা সাধ্যমতো আমল কর। কেননা আল্লাহ তাআলা অধিক আমলের সওয়াব দিতে অপারগ হবেন না, তবে তোমরা অধিক আমল করতে অপারগ হয়ে পড়বে। আর নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর নিকট পছন্দনীয় নামায হলো সেই নামায যা নিয়মিত আদায় করা হয়, যদিও তা কম হয়। যখন তিনি কোনো নামায আদায় করতেন তখন তা নিয়মিত করতেন। (বুখারী) এ বর্ণনা থেকে বুঝা যায় যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম পুরো শা’বানই রোযা রাখতেন। অন্য বর্ণনায় আছে, তিনি শা’বানে সামান্য দিন ছাড়া সবদিনই রোযা রাখতেন। (মুসলিম)
হযরত আয়িশা (রা.) বর্ণিত অপর হাদীসে আছে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এমনভাবে রোযা রাখা আরম্ভ করতেন যে আমরা বলতাম তিনি আর রোযা বাদ দিবেন না। আর যখন রোযা বাদ দিতেন তখন আমরা বলতাম তিনি আর রোযা রাখবেন না। আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে রামাদান ছাড়া অন্য কোনো মাসে রোযা পূর্ণ করতে দেখিনি এবং শা’বান মাস ছাড়া অন্য কোনো মাসে অধিক রোযা রাখতে দেখিনি। (বুখারী)
এ সকল হাদীস থেকে প্রমাণিত হয় যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম শা’বান মাসে অধিক রোযা রাখতেন। এর অন্যতম কারণ হলো, মানুষ রজব ও রামাদান মাসকে অধিক গুরুত্ব দেয়। আর মধ্যখানে শা’বান মাসকে ভুলে যায়। ফলে এ মাসে ইবাদত বন্দেগি কম করে। অথচ এ মাসে মানুষের আমল আল্লাহর দরবারে পেশ করা হয়। নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম চাইতেন তাঁর আমল রোযাদার অবস্থায় আল্লাহর নিকট পেশ করা হোক। তাই তিনি এ মাসে অধিক রোযা রাখতেন।
হযরত উসামা ইবনে যায়দ থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি বললাম- ইয়া রাসূলাল্লাহ, আমি আপনাকে একটি মাসে যেমন রোযা রাখতে দেখি তেমন অন্য কোনো মাসে দেখি না। তিনি জিজ্ঞেস করলেন, কোন মাসে? আমি বললাম, শা’বান। তিনি বললেন, শা’বান হলো রজব ও রামাদান মাসের মধ্যবর্তী মাস। মানুষ এ মাস সম্পর্কে গাফিল থাকে। অথচ এ মাসে বান্দার আমল (আল্লাহর দরবারে) উঠানো হয়। সুতরাং আমি পছন্দ করি যে, আমার আমল রোযাদার অবস্থায়ই উঠানো হোক। আমি বললাম, আপনি তো সোম ও বৃহস্পতিবার রোযা রাখেন। এ দুটিও কি আপনি ছাড়েন না? তিনি বললেন, বান্দার আমল (এ দুই দিনও আল্লাহর দরবারে) উঠানো হয়। সুতরাং আমি পছন্দ করি যে আমার আমল রোযাদার অবস্থায়ই যেন উঠানো হয়। (বায়হাকী, শু‘আবুল ঈমান, খ- ৩, পৃষ্ঠা ৩৭৭, হাদীস নং ৩৮২০)
নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম রামাদান মাসের পর শা’বান মাসের রোযাকে সর্বোত্তম রোযা বলে অভিহিত করেছেন। হযরত আনাস (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে জিজ্ঞেস করা হলো- রামাদানের পর কোন রোযা উত্তম? তিনি বললেন, রামাদানের সম্মানার্থে শা’বানের রোযা। বলা হলো- কোন সদকা উত্তম? তিনি বললেন, রামাদানের সদকা। ইমাম তিরমিযী (র.) বলেন, এ হাদীসটি গরীব (غريب)। (তিরমিযী)

শা’বান মাসে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ও সাহাবায়ে কিরামের আমল
পূর্বোল্লিখিত হাদীসমূহ থেকে আমরা জানতে পেরেছি যে, রাসূলে পাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম শা’বান মাসে বিশেষ গুরুত্ব সহকারে রোযা রাখতেন। তিনি এমনভাবে রোযা রাখতেন মনে হতো যেন আর কখনো রোযা বাদ দিবেন না। বুখারী শরীফে আছে, তিনি পুরো শা’বানই রোযা রাখতেন। অন্য বর্ণনায় আছে, তিনি সামান্য কিছু দিন ছাড়া পুরো শা’বানই রোযা রাখতেন (মুসলিম)।
হযরত আনাস (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রজব মাস শুরু হলে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এ দু‘আ করতেন : “আল্লাহুম্মা বারিক লানা ফী রাজাবা ওয়া শা’বান ওয়া বাল্লিগনা রামাদ্বান” অর্থাৎ হে আল্লাহ! রজব ও শা’বান মাসে আমাদের বরকত দান কর এবং আমাদের রামাদান মাস পর্যন্ত পৌঁছে দাও। (আল আয্্কার লিন নববী, মুজামুল আওসাত লিত তাবারানী)

সাহাবায়ে কিরামও এ মাসকে অত্যন্ত গুরুত্ব দিতেন। এ মাসে তাঁরা কুরআন তিলাওয়াত ও অন্যান্য নেক আমলে সবিশেষ মনোনিবেশ করতেন। হযরত আনাস ইবনে মালিক (রা.) থেকে বর্ণিত, নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর সাহাবীগণ যখন শা’বান মাসের চাঁদ দেখতেন তখন তাঁরা কুরআন তিলাওয়াতে মশগুল হতেন। মুসলমানগণ তাদের সম্পদের যাকাত আদায় করতেন, যাতে দুর্বল ও অভাবগ্রস্ত লোকজন রামাদানের প্রস্তুতি গ্রহণ করতে পারেন। আমীরগণ বন্দীদের তলব করতেন। কারো উপর কোনো হদ (শরীয়ত নির্ধারিত শাস্তি) থাকলে তা প্রয়োগ করতেন অন্যথায় মুক্ত করে দিতেন। ব্যবসায়ীগণ এ মাসে তাদের ঋণ পরিশোধ করতেন। অতঃপর ব্যবসা গুটিয়ে নিতেন। রামাদানের চাঁদ দেখার পর তারা গোসল করতেন এং দুুনিয়াবী কাজ থেকে বিরত থাকতেন। (গুনিয়াতুত তালিবীন, পৃষ্ঠা ২৪৬)

রামাদান মাসের প্রস্তুতির মাস শা’বান
শা’বান মাস মূলত: রামাদান মাসের প্রস্তুতির সময়। এ মাস অত্যন্ত বৈশিষ্ট্যপূর্ণ। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর নিকট এ মাসের আলাদা সম্মান ছিল। এর কারণসমূহের মধ্যে রয়েছে-

প্রথমত : এ মাসে বান্দার আমল আল্লাহর দরবারে পেশ করা হয়। যার বর্ণনা আগে উল্লেখ করা হয়েছে।

দ্বিতীয়ত : রামাদান হলো রহমত, বরকত ও মাগফিরাত অর্জনের মাস। যে সকল বান্দা আল্লাহর সন্তুষ্টি ও পরকালীন কল্যাণ প্রত্যাশা করেন তারা রামাদান মাসের রহমত, বরকত, মাগফিরাত ও দোযখ থেকে মুক্তির কল্যাণবারিতে নিজেকে সিক্ত করতে চেষ্টা-প্রচেষ্টায় লিপ্ত হন। তারা রামাদান মাসে দিনে সিয়াম সাধনায় মনোনিবেশ করেন আর রাত্রিবেলা ইবাদত-বন্দেগিতে অতিবাহিত করেন এবং এর বিনিময়ে মাগফিরাত প্রত্যাশা করেন। কেননা হাদীস শরীফে আছে, রাসূলে পাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেছেন- যে ব্যক্তি ঈমানের সাথে এবং সওয়াবের প্রত্যাশায় রামাদানের রোযা রাখে তার পূর্বেকার সকল গুনাহ মাফ করে দেয়া হয়। আর যে ব্যক্তি ঈমানের সাথে এবং সওয়াবের প্রত্যাশায় শবে কদরে রাত্রি জাগরণ করে তার পূর্বেকার সকল গুনাহ মাফ করে দেয়া হয়। (বুখারী)
হাদীস শরীফে আরও আছে- যে ব্যক্তি ঈমানের সাথে এবং সওয়াবের প্রত্যাশায় রামাদান মাসে রাত্রি জাগরণ করে তার পূর্বেকার সকল গুনাহ মাফ করে দেয়া হয়। (বুখারী ও মুসলিম)
অন্য হাদীসে আছে- যখন রামাদান মাসের প্রথম রাত আসে তখন শয়তান ও জ্বিনদের শৃঙ্খলবদ্ধ করা হয়, দোযখের দরজাসমূহ বন্ধ করা হয় এমতাবস্থায় আর কোনো দরজা খোলা হয় না এবং বেহেশতের দরজাসমূহ খুলে দেয়া হয় তখন আর কোনো দরজা বন্ধ করা হয় না। আর একজন আহবানকারী আহবান করেন : ‘হে কল্যাণপ্রত্যাশী অগ্রসর হও, হে মন্দপ্রত্যাশী সংকুচিত হও। আল্লাহর এমন অনেক বান্দা রয়েছেন যারা দোযখের আগুন থেকে মুক্তি লাভ করবে।’ এ অবস্থা (রামাদান মাসের) প্রত্যেক রাতে চলতে থাকে।(তিরমিযী)
রামাদান মাসের এসব কল্যাণ অর্জন তথা যথাযথ হক আদায় করে রোযা রাখা ও রাত্রি জাগরণের মাধ্যমে রহমত, বরকত ও মাগফিরাতের মহান নিয়ামত অর্জন পূর্ব প্রস্তুতি ছাড়া সম্ভব হবে না। এ প্রস্তুতির মাস হিসেবে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম শা’বান মাসকে অত্যধিক গুরুত্ব দিতেন।
তৃতীয়ত : রাসূলে পাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মানুষের গাফলতের সময়কে আনুগত্য ও মুজাহাদা (ইবাদত-বন্দেগির প্রচেষ্টা) দ্বারা আবাদ করতে চাইতেন, যাতে তারা পরবর্তী মাসের রহমত ও মাগফিরাত থেকে কোনোভাবে বঞ্চিত না হয়। কেননা শা’বান মাসে গাফিল থাকলে এমনও হতে পারে যে রামাদান মাসটাও গাফলতের মধ্যে চলে যাবে এবং বান্দা পরে আফসোস করবে- হায়! রামাদান মাস তো চলে গেল, আমি তো কোনো কল্যাণ অর্জন করতে পারলাম না। আর রামাদান মাসের কল্যাণ থেকে যে বঞ্চিত হয় তার মতো হতভাগা আর কে হতে পারে? তাই রাসূলে পাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম রামাদান মাসের নিয়ামত থেকে বিন্দুমাত্র বঞ্চিত হবার সুযোগ যাতে সৃষ্টি না হয় বরং এর পরিপূর্ণ নিয়ামত যাতে অর্জন করা যায় সেজন্য পূর্ব প্রস্তুতির মাস হিসেবে শা’বানকে গুরুত্ব প্রদান করতেন এবং এ মাসে ইবাদত-বন্দেগি ও সিয়াম সাধনায় মনোনিবেশ করতেন।

শা’বান মাসের সবিশেষ গুরুত্বের প্রতি লক্ষ্য রেখে এবং রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ও সাহাবায়ে কিরাম (রা.)-এর অনুসরণে এ মাসে অধিক পরিমাণে রোযা রাখা এবং কুরআন তিলাওয়াত ও অন্যান্য ইবাদত-বন্দেগিতে অধিক মনোনিবেশে আমাদের সচেষ্ট হওয়া উচিত, যাতে আগত রামাদানের রহমত, বরকত ও মাগফিরাত অন্বেষণে আমরা পরিপূর্ণরূপে নিবিষ্ট হতে পারি এবং পরম দয়াময়ের সীমাহীন অনুগ্রহ লাভ করে ধন্য হই।
 

মঙ্গলবার, ৫ মে, ২০১৫

বিপদ-আপদে আমাদের তাওবাহ-ইসতিগফার করতে হবে


মাওলানা আহমদ হাসান চৌধুরী

সাম্প্রতিক সময়ে আমাদের উপমহাদেশে ঘটে যাওয়া ভুমিকম্পে আমাদের পার্শবর্তী দেশ নেপালে অনেক ক্ষয়-ক্ষতি হয়। আল্লাহ তাআলার অশেষ মেহেরবাণী আমাদের মাতৃভুমিতে কোন বড় ধরনের দুর্ঘটনা ঘটেনি। আমরা ক্ষতিগ্রস্থদের প্রতি সহানুভূতি ও সমবেদনা জানাচ্ছি।
ভুমিকম্পসহ অন্যান্য প্রাকৃতিক দুর্যোগ তথা বিপদ-আপদের কারণ কি? মহান আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন-
وَمَا أَصَابَكُمْ مِنْ مُصِيبَةٍ فَبِمَا كَسَبَتْ أَيْدِيكُمْ وَيَعْفُو عَنْ كَثِيرٍ.
-তোমাদের উপর যে বিপদ পতিত হয় না কেন সেটা তোমাদের কৃতকর্মের ফল। তদুপরি তিনি অনেক বিষয় ক্ষমা করে দেন। (আল-কুরআন, সূরা আশ শূরা, আয়াত নং-৩০)
আমাদের নবীর পূর্বে যে সব নবী-রাসূলগণ আগমন করেছেন তাদের উম্মতদেরকে গোনাহ করার সাথে সাথেই শাস্তি দেওয়া হতো। কিন্তু আমাদের নবী (সা.)-এর জন্য মহান আল্লাহ আমাদের উপর ইহসান করেছেন। তিনি তার রাসূল (সা.) কে বিশেষ্যত্ব দান করেছেন। যার জন্যে আমরা গোনাহ করার সাথে সাথে আল্লাহ তাআলা আমাদেরকে গযব দিয়ে ধ্বংস করেন না। মহান আল্লাহ তার প্রিয় হাবীব (সা.) কে উদ্দেশ্য করে ঘোষনা করেন- وَمَا كَانَ اللَّهُ لِيُعَذِّبَهُمْ وَأَنْتَ فِيهِمْ
(হে নবী) আমি ততক্ষণ পর্যন্ত তাদেরকে শাস্তি দিব না যতক্ষন আপনি পৃথিবীতে থাকবেন। মুফাচ্ছিরীনে কেরাম বলেন- আল্লাহর নিয়ম হচ্ছে কোন নবীর উপস্থিতিতে তাঁর জাতিকে শাস্তিদেন না। শাস্তি দিতে হলে সে নবীকে সরিয়ে নিয়ে শাস্তি নাযিল করেন। যেমন নূহ (আ.)-এর ক্ষেত্রে আমরা দেখেছি।
উক্ত আয়াতের পরবর্তী অংশ হলো- وَمَا كَانَ اللَّهُ مُعَذِّبَهُمْ وَهُمْ يَسْتَغْفِرُونَ
-আল্লাহ ততক্ষণ পর্যন্ত তাদেরকে শাস্তি দিবেন না যতক্ষণ তারা ক্ষমা প্রার্থনা করবে।
সুতরাং ভুমিকম্প বা অন্যান্য যে কোন বালা-মসীবতে আমাদেরকে ইসতেগফার করতে হবে। আমাদের গোনাহর জন্য আল্লাহর দরবারে ক্ষমা চাইতে হবে।
ইসতেগফার ও যিকিরের অভ্যাস গড়ে তুলা উচিত। কেননা সাধারণত আমরা যখন বিপদের মধ্যে পরি তখন আমদের সবচেয়ে চর্চিত বিষয়গুলো মনে পড়ে। আমার এক হুযুর আমাদেরকে বলেছেন তিনি একবার গাড়ি এক্সিডেন্ট করেন। গাড়ি থেকে নামার পরে এক লোক বললেন-আমি অনেক চেষ্টা করেও কালিমাটা স্মরণ করতে পারিনি।ন্তু আশ্চর্য তিনি মনেই করতে পারেন নি। একই গাড়ীতে এক মহিলা ছিলেন। মারাত্মকভাবে আহত হয়েছেন। স্ট্রেচারে করে তাকে নেওয়া হচ্ছে। তিনি বেহুশ অবস্থায় পড়তে লাগলেন- حَسْبُنَا اللَّهُ وَنِعْمَ الْوَكِيلُ
মানুষ যখন বেশি পাপ করে তখন আল্লাহ তাআলা তাদেরকে সতর্ক করার জন্যেও বালা-মসীবত দান করেন। আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন- وما نرسل بالآيات إلا تخويفاً আমি ভয় দেখানোর জন্যই নিদর্শন পাঠিয়ে থাকি।
মহান আল্লাহ আমাদেরকে সতর্ক করে দেন। কিয়ামতের কথা স্মরণ করে দেন।
বিপদের সময় আমাদের করণীয় কি? হাদীস শরীফে এসেছে রাসূল (সা.) ইরশাদ করেন- যখন তোমরা বিপদাপদে পতিত হও তখন তোমরা ইসতিগফার করো, দূর্বলদেরকে সহায়তা করো।
فإذا رأيتم ذلك فافزعوا إلى ذكر الله ودعائه واستغفاره.
আমাদের সমাজে যারা খারাপ কাজ করে তাদেরকে বাধা দেওয়া উচিত। কেননা খারাপ কাজের বাধা না দিলে যারা সৎকর্মশীল আছেন তারাও বিপদে পতিত হবেন। তিরমিযী শরীফে একটি ঘটনা বর্ণিত আছে, রাসূল (সা.) ইরশাদ করেন-
مثل القائم على حدود الله والمدهن فيه كمثل قوم استهموا على سفينة في البحر فأصاب بعضهم أعلاها وأصاب بعضهم أسفلها فكان الذين في أسفلها يصعدون فيستقون الماء فيصبون على الذين في أعلاها فقال الذين في أعلاها لا ندعم تصعدون فتؤذوننا فقال الذين في أسفلها فإننا ننقبها من أسفلها فنستقي فإن أخذوا على أيديهم فمنعوهم نجوا جميعا وإن تركوهم غرقوا جميعا.
-আল্লাহর বিধান পালনকারী এবং অবহেলাকারীদের মধ্যে দৃষ্ঠান্ত হলো একটি জাহাজের আরোহীদের মতো। যারা লটারীর মাধ্যমে দুই তলায় আসন নিয়েছে। একদল উপর তলায় আর একদল নীচ তলায়। নীচ তলার লোকেরা উপর তলায় আরোহন করত পানি সংগ্রহের জন্য। ফলে দ্বিতীয় তলায় পানি পড়ত। তাই উপর তলার লোকেরা বলল তোমরা আমাদের এখানে পানি ফেলে আমাদের কষ্ঠ দিচ্ছ, সুতরাং আমরা তোমাদেরকে উপরে আরোহন করতে দিব না। নীচের তলার লোকেরা বলল, তবে আমরা জাহাজের তলা ফুটা করে পানির ব্যবস্থা করব। এ অবস্থায় উপরের তলার লোকেরা যদি নীচের তলার লোকদের হাত ঝাপটে ধরে ছিদ্র করা থেকে তাদেরকে বিরত রাখে তবে সকলেই বেঁচে যেতে সক্ষম হবে। কিন্তু যদি এদেরকে এ কাজে বাধা না দেয় তাহলে সকলেই ডুবে যাবে।
আমাদের সকলের উচিত খারাপ কাজ দেখলে বাধা দেওয়া। একটি জাতির উপর যখন আল্লাহর গযব আসলো তখন ফিরিশতারা আল্লাহর কাছে বললেন আল্লাহ! তাদের মধ্যে তো নেককার লোকও আছে। আল্লাহ তাআলা বললেন তাদেরকে সহ ধ্বংস করো, কেননা তারা তাদের দায়িত্ব আদায় করে নি। কারণ তাদের দায়িত্ব ছিল তারা খারাপ লোকদের বাধা দিবে।
বনী ইসরাইল জাতি ধ্বংসের কারণ হিসাবে আল্লাহ তাআলা বলেন
كَانُوا لَا يَتَنَاهَوْنَ عَنْ مُنْكَرٍ فَعَلُوهُ لَبِئْسَ مَا كَانُوا يَفْعَلُونَ.
তারা যে নিকৃষ্ট কাজ করত তা থেকে একে অপরকে বারণ করত না, তারা যা করত তা অবশ্যই খারাপ।
(আল-কুরআন, সূরা আল মায়িদা:৭৯)
ভুমিকম্প থেকে বাঁচার জন্যে আল্লাহর দরবারে তাওবাহ, ইসতিগফারের পাশাপাশি আমাদের জাগতিক সব ধরনের প্রস্তুতি থাকা উচিত। এটা দূষণীয় নয়। আল্লাহর উপর ভরসা করব সাথে জাগতিক প্রস্তুতিও রাখব। হাদীস শরীফে আছে এক সাহাবী রাসূল (সা.)-এর দরবারে আসলেন। তিনি রাসূল (সা.) কে বললেন ইয়া রাসূলাল্লাহ! আমার উট ছেড়ে দিয়ে আল্লাহর উপর ভরসা করবো না কি বেঁধে আল্লাহর উপর ভরসা করব? রাসূল (সা.) ইরশাদ করলেন أعقلها وتوكلউট বেধে আল্লাহর উপর ভরসা করো। সুতরাং আমরা আল্লাহর উপর ভরসা করার সাথে সাথে জাগতিক সব ধরনের ব্যবস্থাও রাখব।
...........................
বর্তমান সময়ে শ্রমিকের অধিকার নিয়ে মানুষ অনেক উচ্চকন্ঠ। কিছুদিন পূর্বেও পাশ্চাত্যে শ্রমিকদের সাথে অমানুষিক আচরণ করা হতো। আন্দোলনের মাধ্যমে তাদেরকে অধিকার আদায় করে নিতে হয়েছে। কিন্তু ইসলামের নবী মানবতার নবী মুহাম্মদ (সা.) শ্রমকে শ্রদ্ধা করতে, শ্রমিককে তার ন্যায্য অধিকার দিতে স্পষ্ঠ নির্দেশনা দিয়েছেন। রাসূল (সা.) ইরশাদ করেন- أَعْطُوا الْأَجِيرَ أَجْرَهُ، قَبْلَ أَنْ يَجِفَّ عَرَقُهُ শ্রমিকের ঘাম শুকানোর আগেই তার পারিশ্রমিক আদায় করো।
ইসলামে কষ্টার্জিত উপার্জনকে সর্বোত্তম বলা হয়েছে। হাদীসে এসেছে-
مَا أَكَلَ أَحَدٌ طَعَامًا قَطُّ خَيْرًا مِنْ أَنْ يَّأْكُلَ مِنْ عَمَلِ يَدَيْهِ وَإِنَّ نَبِىَّ اللهِ دَاؤُوْدَ عَلَيْهِ السَّلاَمُ كَانَ يَأْكُلُ مِنْ عَمَلِ يَدَيْهِ
-কারো জন্যে নিজ হাতে উপার্জন অপেক্ষা উত্তম আহার্য আর নেই। আল্লাহর নবী দাঊদ (আ.) নিজ হাতে উপার্জন করতেন।
ইসলাম ভিক্ষা করাকে নিরুৎসাহিত করেছে। নিজে কাজ করে খাওয়াকেই উৎসাহিত করেছে। নামায, রোযা সহ বিভিন্ন ফরয ইবাদতের পাশাপাশি নিজের জন্যে, নিজের পরিবারের জন্যে হালাল রুযী অর্জন করাও ফরয। আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন-
فَإِذَا قُضِيَتِ الصَّلَاةُ فَانْتَشِرُوا فِي الْأَرْضِ وَابْتَغُوا مِنْ فَضْلِ اللَّهِ
-তোমরা নামায শেষ করে যমীনে ছড়িয়ে পড়ো এবং আল্লাহর অনুগ্রহ অন্বেষণ করো।
হালাল উপার্জন করা আমাদের সকলের জন্যে আবশ্যক। উপার্জনের মাধ্যম আমাদের সকলের এক হয় না। এখানে আমরা কেউ মালিক আবার কেউ শ্রমিক। আমরা কেউ অফিসের কর্মকর্তা আবার কেউ আমাদের অধীনস্ত। কিন্তু সকলের উদ্দেশ্য এক। হালাল উপার্জন করা। আমাদের অধিনস্ত যারা আছে তাদের প্রতি আমাদের সহানুভূতি দেখানো উচিত। কেননা তারাও আমাদের ভাই। রাসূল (সা.) ইরশাদ করেন-
إخوانكم خُوَلُكم، جعلهم الله تحت أيديكم، فلا تُكَلِّفُوهم ما يغلبهم، فإن كَلَّفتموهم فأعينوهم
-তোমাদের অধিনস্তরা তোমাদের ভাই। আল্লাহ তাদেরকে তোমাদের অধিনস্ত করে দিয়েছেন। তাদের সাধ্যাতীত কাজ তাদের উপর চাপিয়ে দিও না। যদি চাপাতে চাও তাহলে তাদের সাহায্য করো।
এক সাহাবী তার গোলামকে নিয়ে বের হয়েছেন। পথিমধ্যে লোকজন চিনতে পারে নাই মুনিব কে আর গোলাম কে। তারা এর কারণ জানতে চাইলে তিনি বললেন তোমরা কি রাসূল (সা.)-এর হাদীস শুনো নাই? রাসূল (সা.) ইরশাদ করেছেন- তোমরা যা খাবে তাদেরকেও তা খাওয়াবে, তোমরা যা পরবে তাদেরকেও তা পরাবে।
শ্রমিকদের প্রতি আমাদের দয়া করা আমাদের কর্তব্য। এটা শ্রমিকদের হক। যে কাজ শ্রমিকের জন্য কষ্টকর সে কাজ তাদের দিয়ে করানো একপ্রকার অত্যাচার। তাদের প্রতি দয়া দেখাতে হবে। রাসূল (সা.) ইরশাদ করেন الراحمون يرحمهم الرحمن দয়াশীলের প্রতি রহমান (আল্লাহ) দয়া করেন। তিনি আরো বলেন من لا يرحم لا يرحم যে দয়া করে না সে দয়া পায় না। শ্রমিককে তার যথাযথ মজুরী প্রদানে জোর তাকীদ এসেছে। আল্লাহ তাআলা নির্যাতিত শ্রমিকদের পক্ষে থাকেন। হাদীসে রাসূল (সা.) ইরশাদ করেন-
ثلاثة أنا خَصمُهم يوم القيامة: رجل أَعطي بي ثم غدر، ورجل باع حرا فأكل ثمنه، ورجل استأجر أجيرا فاستوفى منه ولم يعط أجره
আল্লাহ তা‘আলা ফরমান, আমি কিয়ামতের দিন তিন শ্রেনীর মানুষের বিরুদ্ধে বাদী হবো। প্রথমত এমন লোক যে আমার নামে কাউকে অঙ্গীকার করলো অত;পর গাদ্দারী করলো, দ্বিতীয়ত এমন লোক যে স্বাধীন মানুষকে বিক্রি করল এবং এর মূল্য খেলো, তৃতীয়ত এমন লোক যে কোন শ্রমিক নিয়োগ করলো আর সেই শ্রমিক যথাযথভাবে তার দায়িত্ব আদায় করলো, কিন্তু তার পারিশ্রমিক আদায় করেনি।
এই তিন শ্রেনীর লোকের বিরুদ্ধে আল্লাহ তাআলা কিয়ামতের দিন বাদী হবেন।
শ্রমিকদেরও অনেক দায়িত্ব ও কর্তব্য আছে। যখন কোন কাজ আদায় করবে তখন যথাযথভাবে আদায় করবে, কাজকে নিজের মনে করে সুন্দরভাবে করবে। হাদীস শরীফে এসেছে-
إِنَّ اللهَ تَعَالَى يُحِبُّ مِنَ الْعَامِلِ إِذَا عَمِلَ أَنْ يُّحْسِن
সুন্দরভাবে কাজ সম্পাদনকারী শ্রমিককে আল্লাহ তাআলা ভালোবাসেন।
শ্রমিকরা নিজেদেরকে নির্যাতিত মনে করলে তারা নিয়মের মধ্যে থেকে শান্তিপূর্ণভাবে এর প্রতিবাদ করতে পারে। কিন্তু রাগ-বিরাগ বা আবেগের বশবর্তী হয়ে নিজের কল-কারখানা, অফিসের ক্ষতি সাধন উচিত নয়।কেননা এটাই তার রিযিক পাওয়ার মাধ্যম। হাদীসে এসছে من رزق في شيئ فليلزمهযাকে কোন মাধ্যমে রিযিক দেওয়া হলো, উচিত হলো সে তা আঁকড়ে থাকবে। অর্থ্যাৎ নিজের উপার্জনের মাধ্যমকে আল্লাহর নি‘আমত মনে করে তার মূল্যায়ন করতে হবে।
আজকে আমরা দুটি বিষয়ে আলাচনা করলাম। প্রথমত বিপদাপদ প্রসঙ্গ। আমরা জানতে পারলাম বিপ; আল্লাহর পক্ষ থেকে আসে। কখনো মানুষের গোনাহের কারণে আবার কখনো আল্লাহর পক্ষ থেকে পরীক্ষা ও ভীতি প্রদর্শনের জন্য।
দ্বিতীয়ত আমাদের অধীনস্ত মানুষদের প্রতি সদাচরণ করা ইসলামের নির্দেশ। বিশেষত শ্রমজীবি মানুষের প্রতি আমাদের সদাচরনের জন্য প্রিয়নবী (সা.) জোর তাকীদ প্রদান করেছেন। আল্লাহ উত্তম তৌফিক দাতা।
১.০৫.১৫
[অনুলিখন : মাওলানা মাহমুদুল হাসান]

সোমবার, ৪ মে, ২০১৫

রজব মাস হলো রামাদ্বান মাসের প্রস্তুতির মাস


মাওলানা আহমদ হাসান চৌধুরী
الحمد لله المتقدس بنعوت الكمال، المتعالي علي عباده بصفات الجلال، الي عباده بصفات الجمال، نحمده حمد الشاكرين لفضله، المقرين بألوهيته ووحدانيته، ونصلي ونسلم علي سيدنا محمد، السابق إلي الأنام نورُه، والرحمة للعالمين ظهورُه، صلوةً تستغرق العد، وتحيط بالحد، لا أمد لها، ولا انقضاء لها، ولا انفصام لها، ولا انقطاع لها، وعلي اله الأطهار وصحبه الأبرار. أما بعد-
আলহামদুলিল্লাহ! আমরা রজব মাসের প্রথম জুমু‘আয় উপস্থিত হতে পেরেছি। মহান আল্লাহর দরবারে শুকরিয়া আদায় করি। রজব মাস মুসলমানদের কাছে বিশেষ একটি কারণে খুবই গুরুত্বপূর্ণ। আমরা জানি এই মাসে মহান আল্লাহ তা‘আলা তার প্রিয় হাবীব হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে আরশে আযীমে নিয়ে মি’রাজ করিয়েছেন। ইসরাকে (মক্কা শরীফ থেকে বায়তুল মুকাদ্দাস পর্যন্ত) অস্বীকার করা কুফরী। মহান আল্লাহ তা‘আলা এ সম্পর্কে ফরমান-
سُبْحَانَ الَّذِي أَسْرَى بِعَبْدِهِ لَيْلًا مِنَ الْمَسْجِدِ الْحَرَامِ إِلَى الْمَسْجِدِ الْأَقْصَى الَّذِي بَارَكْنَا حَوْلَهُ لِنُرِيَهُ مِنْ آيَاتِنَا إِنَّهُ هُوَ السَّمِيعُ الْبَصِيرُ.
-পবিত্রতা ও মহিমা সেই মহান সত্ত্বার যিনি তার বান্দাহকে রাতে ভ্রমন করিয়েছেন মাসজিদুল হারাম থেকে মাসজিদুল আকসা পর্যন্ত-- যার আশপাশ আমি বরকতময় করেছি-- তাঁকে আমার নিদর্শনসমূহ দেখানোর জন্য। নিশ্চয়ই তিনি সব কিছু শুনেন এবং সব কিছু দেখেন।
রজব মাস রাসূল (সা.)-এর মি‘রাজের মাস। এই মাসকে আল্লাহর মাস বলা হয়। হাদীস শরীফে এসেছে হযরত আবদুল্লাহ ইবনু উমর (রা.) বলেন-
وَإِنَّمَا سُمِّيَ رَجَبٌ ، لأَنَّ الْمَلائِكَة تَرْجُبُ فِيهِ بِالتَّسْبِيحِ وَالتَّحْمِيدِ وَالتَّمْجِيدِ لِلْجَبَّارِ عَزَّ وَجَلَّ.
-রজব মাসকে রজব বলার কারণ হলো এই মাসে ফিরিশতারা বেশি বেশি মহান আল্লাহর তাসবীহ, তাহলীল এবং তাহমীদ করেন। আমাদেরকেও এর সাথে বেশি বেশি তাসবীহ পড়া উচিৎ। বুখারী শরীফের শেষ হাদীস, রাসূল (সা.) ইরশাদ করেন-
كَلِمَتَانِ حَبِيبَتَانِ إِلَى الرَّحْمَنِ خَفِيفَتَانِ عَلَى اللِّسَانِ ثَقِيلَتَانِ فِي الْمِيزَانِ سُبْحَانَ اللَّهِ وَبِحَمْدِهِ سُبْحَانَ اللَّهِ الْعَظِيمِ.
-দু’টি শব্দ মহান আল্লাহর নিকট খুবই প্রিয়, যা উচ্চারণে অতি হালকা কিন্তু মিযানের পাল্লায় খুবই ভারি, শব্দ দু’টি হলো- سُبْحَانَ اللَّهِ وَبِحَمْدِهِ سُبْحَانَ اللَّهِ الْعَظِيمِ
রজব মাস সম্পর্কে আবুল ওয়াররাক বলখী (র.) বলেন-
شهر رجب شهر الزرع وشعبان شهر السَّقِي للزرع، وشهر رمضان شهر حصاد الزرع.
-রজব হলো চারা রূপনের মাস, শা‘বান হলো পানি সিঞ্চনের মাস আর রামাদান হলো ফল আহরণের মাস।
সুতরাং রজব মাস থেকে আমাদেরকে রামাদানের প্রস্তুতি শুরু করতে হবে।
হাদীস শরীফে আরো এসেছে-
كان رسول الله صلى الله عليه و سلم إذا دخل رجب قال : اللهم بارك لنا في رجب وشعبان وبلغنا رمضان
-রজব মাস আসলে রাসূল (সা.) দু‘আ করতেন-হে আল্লাহ তুমি আমাদেরকে রজব এবং শা‘বান মাসের বরকত দান করো আর রামাদান পর্যন্ত পৌঁছে দাও।
হযরত আনাস (রা.) হতে বর্ণিত রাসূল (সা.) ইরশাদ করেন-
إِنَّ فِي الْجَنَّةِ نَهْرًا ، يُقَالُ لَهُ : رَجَبٌ ، مَنْ صَامَ مِنْ رَجَبٍ يَوْمًا وَاحِدًا ، سَقَاهُ اللَّهُ مِنْ ذَلِكَ النَّهْرِ.
-জান্নাতে একটি ঝর্ণা আছে যার নাম রজব। যে ব্যক্তি রজবে একটি রোযা রাখবে মহান আল্লাহ তাকে এই ঝর্ণার পানি পান করাবেন।
মহান আল্লাহ যেন আমাদেরকে রজবের আমল করার তাওফীক দান করেন। আমীন।
.................
ভারত উপমহাদেশ এবং আমাদের দেশের মুসলমানদের কাছে রজব মাস আরো দু‘টি কারণে গুরুত্বপূর্ণ। একটি হলো এই মাসের ৬ তারিখ অর্থাৎ ৬ রজব সুলতানুল হিন্দ হযরত খাজা গরীবে নেওয়ায শাহ মুঈনুদ্দীন চিশতী সনজরী আজমিরী (র.)-এর ওফাত দিবস। আর ২০ রজব হযরত খাজা শরফুদ্দীন চিশতী (র.)-এর ওফাত দিবস।
ভারত উপমহাদেশে ইসলাম আগমন সম্পর্কে সকল ঐতিহাসিক একমত যে এ উপমহাদেশে আউলিয়ায়ে কেরামের মাধ্যমে ইসলাম প্রচার হয়েছে। সুফিয়ায়ে কেরাম ইসলামের পতাকা উড়িয়েছেন। সে জন্যে উপমহাদেশে ও আমাদের দেশের মুসলমানগণ তাদের কাছে চির কৃতজ্ঞ।
খাজা মুঈনুদ্দীন চিশতী (র.) সহ অন্যান্য আউলিয়ায়ে কেরাম এ দেশে তরবারীর জোরে ইসলাম প্রচার করেন নি। তাঁরা তাদের আদর্শ, মহত্ত্ব দিয়ে মানুষের মন জয় করেছেন।
খাজা আজমীরী (র.) যখন ভারতে আসেন তখন আজমীরের শাসক ছিল পৃথ্বিরাজ। সে ছিল খুবই অত্যাচারী শাসক ছিল। রাজা পৃথ্বিরাজ কোন এক মুসলমানকে ( সম্ভবত তাঁরই দরবারের সাথে সম্পর্কিত কেউ হবেন)- কষ্ট ও বিপদের মধ্যে ফেলেন। এর প্রতিকার চেয়ে হযরত খাজা মু’ঈনুদ্দীন চিশতী (র) পৃথ্বিরাজকে একটি পত্র লিখেন। পৃথ্বিরাজ অত্যন্ত গর্বভরে অবমাননাকর ভাষায় ঐ পত্রের জবাবে বলেন- ‘এই লোকটি এখানে আসার পর এমন বড় বড় কথা বলে যা কেউ কখনও বলেনি এবং শুনেও নি।’ হযরত খাজা মু’ঈনুদ্দীন চিশতী (র) ঐ জবাব শুনে বললেন, ‘ আমি পৃথ্বিরাজকে জীবিত বন্দী করে মুহাম্মাদ ঘুরীর হাতে তুলে দিলাম’। সেই রাতে মুহাম্মদ ঘুরী স্বপ্নে দেখেন কোন এক বুযুর্গ তাকে বলছেন- কাল যদি তুমি ভারত আক্রমন করো তাহলে তুমি ভারত জয় করতে পারবে। মুহাম্মদ ঘুরী ইতিপূর্বে ভারত আক্রমন করে ব্যর্থ হয়েছেন। এ স্বপ্ন দেখার পর সভাসদদের সাথে আলোচনা করে ভারত আক্রমন করেন। মুহাম্মদ ঘুরী ভারত জয় করেন এবং পৃথ্বিরাজকে বন্দী করেন। মহান আল্লাহ তার ওলীর কথাকে সত্যে পরিণত করলেন। ঘটনাটি আবুল হাসান আলী আন-নদভী তার “দা‘ওয়াত ও আযীমত” কিতাবে উল্লেখ করেছেন।
শায়খ আবদুল হক মুহাদ্দিসে দেহলবী (র.) “আখবারুল আখয়ার” কিতাবে লিখেন- হযরত খাজা মুঈনুদ্দীন চিশতী (র.)-এর ইন্তিকালের পর তার কপালের উপর লেখা ফুটে উঠে- حبيب الله مات في حب الله “আল্লাহর বন্ধু, আল্লাহর ভালোবাসায় ইন্তিকাল করেছেন”। জানা যায় তার কপালে এই লেখা দেখে বহু লোক ইসলাম গ্রহণ করে।
খাজা ছাহেব (র.)-এর সময়ে ভারতে যাদুবিদ্যার প্রচলন খুব বেশি ছিল। যে যুগে যে সব বিষয়ের বেশি প্রচলন ছিল আল্লাহ তাআলা সে যুগের নবীকে উক্ত বিষয়ের মু‘জিযা দান করেছেন। হযরত মুসা (আ.)-এর সময়ে যাদুর চর্চা ছিল। এই সকল যাদুকরের যাদুকে অক্ষম করতে আল্লাহ তাআলা মুসা (আ.) কে লাঠি ও শুভ্র হাত দিয়েছেন। ঈসা (আ.)-এর যুগে চিকিৎসা বিষয়ে মানুষ পারদর্শী ছিল। তাই তাঁকে আল্লাহ তা’আলা জন্মান্ধ ও ধবল রোগীকে সুস্থ করার মু’জিযা প্রদান করেন। আমাদের নবী (সা.)-এর সময়ে কবিতা চর্চার প্রচলন ছিল ব্যপক। তৎকালীন প্রসিদ্ধ কবিগণ বিভিন্ন মেলায় কবিতার আসর করত, চর্চা করত। আল্লাহ তাআলা পবিত্র কুরআন নাযিল করে এই সব কবিদের কাব্যপ্রতিভাকে অক্ষম করে দিলেন। মহান আল্লাহ নিজেই ঘোষণা করলেন এর ছোট একটি আয়াতের সমান আয়াত রচনা করতে। কিন্তু তারা তা পারে নি।
আল্লাহ তাআলা নবীদেরকে অলৌকিক যে ক্ষমতা দান করেন তাকে মু‘জিযা বলে আর ওলীগণকে যে ক্ষমতা দান করেন তাকে কারামত বলে। কারামত সম্পর্কে আহলে সুন্নত ওয়াল জামাতের আকীদা কি, সে সম্পর্কে আকাইদে নাসাফীতে বলা হয়েছে- كرامة الأولياء حق-আউলিয়ায়ে কেরামের কারামত সত্য।
খাজা মুঈনুদ্দীন চিশতী (র.) সব সময় ওযূর সহিত থাকতেন, সারাজীবন দিনে রোযা রাখতেন রাতের বেলা ইবাদত করতেন। দিন-রাত চব্বিশ ঘন্টার মধ্যে দু’বার কুরআন শরীফ খতম করতেন।
আগে একবার বলেছি যে ভারত উপমহাদেশে ইসলাম প্রচার করেছেন আউলিয়ায়ে কিরাম। তাঁরা তাদের আদর্শ দিয়ে মানুষকে ইসলামের ছায়াতলে নিয়ে এসেছেন। হযরত খাজা মঈনুদ্দীন চিশতী (রা.) (র.) ছিলেন সিজিস্তানের মানুষ। তিনি স্থানীয় ভাষা বুঝতে পারতেন না। হযরত শাহজালাল মুর্জারাদে ইয়ামনী (র.) ছিলেন ইয়ামনের অধিবাসী, আরবী ভাষাভাষী। তিনি বাংলা বুঝতেন না। এখানে যারা বাসিন্দা ছিলেন তারাও আরবী বুঝতেন না। তাহলে তারা কিভাবে ইসলাম প্রচার করলেন? তাদের কথা মানুষ কিভাবে বুঝতো অথবা তারা কিভাবে মানুষের কথা বুঝতেন? মানুষ তাদের চেহারা দেখে, তাদের আদর্শ দেখে মুসলমান হয়েছে। রাসূল (সা.) ইরশাদ করেন إذا رؤوا ذكر الله -ওলী হচ্ছেন তিনি যাকে দেখলে মহান আল্লাহকে স্মরণ হয়।
আমরা এই সব মহান বুযুর্গদের কাছে কৃতজ্ঞ। আমাদের উচিত তাদের জন্য দু‘আ করা। তাদের জন্যে দু‘আ করলে আমরাই উপকৃত হবো। আমরা তাদের রূহানী ফায়য লাভ করতে পারব। দু’রাকাআত নামায পড়ে অথবা কুরআন তিলাওয়াত করে, সাদকাহ করে অথবা অন্য নেক আমল করে তাদের রূহের উদ্দেশ্যে ঈসালে সাওয়াব করতে পারি। রূহ মারা যায় না। মুসলমান হোক অথবা বিধর্মী হোক, কারো রূহ মারা যায় না। কুরআন শরীফে ইরশাদ হচ্ছে وَنَفَخْتُ فِيهِ مِنْ رُوحِي আমি তার মধ্যে আমার রূহ ফুঁকে দিয়েছি।
হযরত আজমীরী (র.) সম্পর্কে আমাদের পীর ও মুরশিদ হযরত আল্লামা আব্দুল লতীফ ফুলতলী ছাহেব কিবলাহ (র.)-এর একটি ঘটনা মনে পড়ল। হযরত ফুলতলী ছাহেব কিবলা (র.) বলেন আমি ছাত্র জীবনে আযমিরী (র.)-এর মাযারে খুব বেশি আসা-যাওয়া করতাম। একদিন আযমিরী (র.) আমাকে বলছেন- এখানে বেশি আসার প্রয়োজন নেই। বদরপুরেই থাকো। ওখান থেকেই তুমি সবকিছু হাসিল করতে পারবে। ছাহেব কিবলাহ (র.) স্বপ্নে না মুরাকাবায় সাক্ষাৎ করেছেন তা আমাদের বলেন নি। সুবহানাল্লাহ। এটাই হচ্ছে ওলীদের ক্ষমতা। ইন্তেকালের পরেও তারা সঠিক পথ দেখাতে পারেন।
আউলিয়ায়ে কেরামের দরগাহ গরীব-অসহায়দের আবাসস্থল। আমাদের সামনে যিনি শুয়ে আাছেন খাজা শরফুদ্দীন (র.), তার দরগাহতে প্রতিদিন কয়েকশ’ গরীব-অসহায়কে খাদ্য বিতরণ করা হয়। আমাদের কারো বাড়িতে কি সম্ভব প্রতিদিন দুইশত মানুষকে খাবার প্রদান করা? সম্ভব নয়। ওলীগণের ইীন্তকালের পরেও মানুষ তাদের কাছ থেকে উপকৃত হয়।
আমরা আউলিয়ায়ে কেরামের মাযারে যাই। সুন্নত নিয়মানুযায়ী মাযার যিয়ারত করি। তাদের ওসীলা নিয়ে আল্লাহর দরবারে দু‘আ করি। উমাইয়া (রা.) থেকে বর্ণিত আছে যে, নবী করীম সাল্লাল্লাহ আলাইহি ওয়াসাল্লাম গরীব মুহাজিরদের ওসীলায় বিজয়ের দু‘আ করতেন। (শরহুস সুন্নাহ)
আমরা ওলীর কাছে চাই না বরং তার ওসীলা নিয়ে আল্লাহর দরবারে দুআ করি। এখন কিছু ভ-ের কারণে তো আমরা হক্কানী ওলীদের থেকে দূরে থাকতে পারি না। আসলের সাথে নকল সব সময় ছিল, থাকবে। তাফসীরের ক্ষেত্রেও ভেজাল করা হয়েছে। শি‘আ, মু‘তাযিলা, খারেজীরা তাদের ইচ্ছামতো কুরআন শরীফের তাফসীর করেছে, তাফসীর বির রায় করা হয়েছে। তাই বলে কি আমরা সঠিক তাফসীরগুলো ছেড়ে দিব? রাসূল (সা.)-এর ওফাতের কিছুকাল পরেই হাদীসের ক্ষেত্রে জাল হাদীস রচনা শুরু হয়। স্বার্থান্বেষী মানুষ নিজ স্বার্থে হাদীস বানাতো। এক মুসলিম বাদশাহকে এক বেগুন বিক্রেতা তার বেগুনের গুনাবলী বর্ণনা করার জন্যে বানিয়ে বললো রাসূল (সা.) ইরশাদ বরেছেন- বেগুন সকল রোগের ঔষধ। রাসূল (সা.)-এর হাদীস শুনে খলীফা বেগুন নিলেন। খাওয়ার পর তার চুলকানী রোগ হয়ে গেল। বাদশাহ বিক্রেতাকে ধরিয়ে এনে বললেন তুমি বললে সকল রোগের ঔষধ কিন্তু আমার তো চুলকানী হয়ে গেছে। তখন সে বলল ওহ! আমি ভূলে গিয়েছিলাম। হাদীসে ছিল চুলকানী রোগ ছাড়া সকল রোগের ঔষধ।
এভাবে নিজ স্বার্থে কিছু লোক হাদীস বানিয়ে রাসূল (সা.)-এর নামে চালিয়ে দিত। জাল হাদীসের ছড়াছড়ি শুরু হলো। তাই বলে কি আমরা মূল হাদীস ছেড়ে দিব? যে কোন ভালো ভালো পন্য বাজারে আসলে তার নকলও বের হয়। সে জন্যে তো আমরা আসলকে ছেড়ে দেই না। তদ্রুপ তাসাউফের নামে ভ-ামী করলে আমরা ভ-ামী থেকে দূরে থাকবো কিন্তু হাক্কানী ওলী আউলিয়াকে ত্যাগ করতে পারি না। তাদের আদর্শ অনুসরণ করব। কারণ যাকে মুহাব্বাত করা হয় তার সব কিছু অনুসরণ করতে হয়। এক কবি বলেন- إن المحب لمن يحب مطيع
আউলিয়ায়ে কিরামের আদর্শ ছিল মানুষকে তাওহীদ-রিসালতের পথে আহ্বান করা, অসহায় দুঃস্থ মানুষের সেবা করা, দ্বীনের খেদমত করা। আল্লাহ তা‘আলা ইরশাদ করেন- صِبْغَةَ اللَّهِ وَمَنْ أَحْسَنُ مِنَ اللَّهِ صِبْغَةً
আউলিয়ায়ে কেরাম আল্লাহর রঙ্গে রঙ্গিন ছিলেন।
মহান আল্লাহ যেন আমাদেরকে আউলিয়ায়ে কিরামের অনুসরণের তাওফীক দান করেন। আমীন।
..................
এখন নামায সম্পর্কে দু’টি কথা বলতে চাই। আমরা যখন একাকী নামায পড়ি তখন সূরা আসর এবং কাউসার পড়ে দায় সারি। কিন্তু ইমামতির সময় লম্বা সূরা পাঠ করে মানুষের বিরক্তি বাধিঁয়ে দেই।
জামা‘আতের সহিত নামায আদায় করলে আমাদের নামায কেমন হওয়া উচিৎ প্রিয়নবী (সা.) থেকে এ ব্যাপারে দিক নির্দেশনা পাই।। একবার হযরত মু‘য়ায বিন জাবাল (রা.) নামাযের ইমামতি করছেন। তিনি নামাযে সূরা বাকারাহ তিলাওয়াত শুরু করলেন। একজন নামায ছেড়ে দিয়ে একাকী সংক্ষিপ্তভাবে নামায পড়লেন। তখন তাকে মু‘আয (রা.) মুনাফিক বলে ধারনা করলেন। লোকটির কাছে এ সংবাদ পৌছলে তিনি রাসূল (সা.)-এর কাছে এসে বললেন ইয়া রাসূলাল্লাহ! আমরা হাত দিয়ে খেটে খাওয়া এবং উট দিয়ে পানি সিঞ্চনকারী লোক। মু‘আয নামাযে সূরা বাকারাহ তিলাওয়াত শুরু করছেন। তাই আমি একা নামায সংক্ষেপে আদায় করে চলে গেছি। ফলে তিনি আমাকে মুনাফিক ধারণা করেছেন। রাসূল (সা.) তিনবার বললেন হে মু‘আয! তুমি কি ফিতনা সৃষ্টি করছ? (জামা‘আতে নামায আদায় করলে) সূরা শামস এবং আ‘লা দিয়ে পড়বে। আরেক বর্ণনায় আছে, সূরা শামস এবং আ‘লা দিয়ে পড়বে কেননা তোমাদের পিছনে বৃদ্ধ, দূর্বল এবং হাজতওয়ালা লোক নামায আদায় করে।
তাই আমরা যখন জামা‘আতে নামায পড়ব সংক্ষিপ্ত নামায পড়ব। একাকী হলে যত ইচ্ছা লম্বা নামায পড়ব। হাদীসে এসেছে-
وعن أبي هريرة - رضي الله عنه : أن رسول الله - صلى الله عليه وسلم - قال: إذا صلى أحدكم للناس فليخفف؛ فإنه منهم الضعيف، والسقيم، والكبير، وإذا صلى أحدكم لنفسه فليطول ما شاء.
-হযরত আবূ হুরায়রা (রা.) হতে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেছেন: তোমরা যখন মানুষকে নিয়ে (জামা‘আতে) নামায আদায় করো তখন সংক্ষিপ্তভাবে পড়। কেননা তাদের মধ্যে দূর্বল, অসুস্থ এবং বৃদ্ধ লোক থাকে। আর যখন একাকী নামায পড় তখন যতক্ষন ইচ্ছা লম্বা করো।
(সুপ্রিম কোর্ট মাজার মসজিদে জুমআপূর্ব বয়ান, ৪-০৫-২০১৫
অনুলিখন : মাহমুদুল হাসান)

বুধবার, ২২ এপ্রিল, ২০১৫

ন্যায়পরায়নতা ও ইহসান : ইসলামের দৃষ্টিভঙ্গি


মাওলানা আহমদ হাসান চৌধুরী

মহান আল্লাহ মানব জাতির হেদায়তের জন্যে রাসূল (সা.)-এর কাছে পবিত্র কুরআন শরীফ নাযিল করেন। এই কুরআন এমন একটি বিস্ময়কর গ্রন্থ যার তুলনার সমকক্ষ কোন গ্রন্থ নেই, অমুসলিমরাও এটা স্বীকার করতে বাধ্য হয়েছে। আরবে কবিতা চর্চার রীতি ছিল। উকায মেলায় পৃথিবী বিখ্যাত কবিরা আসতেন, তাদের কবিতা পাঠ করতেন। যাদের কবিতা নির্বাচিত হতো তাদের কবিতা কা‘বা শরীফে ঝুলিয়ে রাখা হতো। সূরা কাউসার অবতীর্ণ হওয়ার পর রাসূল (সা.) সেটা লিখে কা‘বা শরীফে ঝুলিয়ে দেন এবং ঘোষণা দেন যে, এই সূরার পরের লাইন মিলিয়ে দেওয়ার জন্য। রাসূল (সা.)-এর সময়ে আরবের প্রসিদ্ধ ও বয়োবৃদ্ধ কবি ছিলেন লবীদ ইবনু রবী‘আহ। পরবর্তীতে তিনি ইসলাম গ্রহণ করেছিলেন। তিনি সূরা কাউসারের শেষে লিখেন ليس هذا كلام البشر অর্থ্যাৎ- এটা কোন মানুষের কথা নয়।সুতরাং বুঝা গেল সে এটা স্বীকার করছে যে কুরআন আসমানী গ্রন্থ।
আল্লাহ তা‘আলা সেই কুরআনে ইরশাদ করেন-
{ إِنَّ اللَّه يَأْمُر بِالْعَدْلِ وَالْإِحْسَان وَإِيتَاء ذِي الْقُرْبَى وَيَنْهَى عَنْ الْفَحْشَاء وَالْمُنْكَر وَالْبَغْي يَعِظكُمْ لَعَلَّكُمْ تَذَكَّرُونَ
-নিশ্চয় আল্লাহ তাআলা তোমাদেরকে ন্যায়পরায়নতা, ইহসান, ও আত্মীয়তা রক্ষার নির্দেশ দিচ্ছেন এবং যাবতীয় অশ্লীল, গর্হীত কাজ ও বিদ্রোহ করা থেকে নিষেধ করছেন।
আয়াতটি নাযিল হওয়ার পর রাসূল (সা.) ওয়ালীদ ইবনু মুগীরাহকে শুনালেন। ওয়ালীদ এই আয়াত শুনে বলল- إن له لحلاوة وإن عليه لطلاوة
এই আয়াতে কতো মিষ্ঠতা এবং এই আয়াত সব কিছুর নির্যাস।(শুআবুল ঈমান)
হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে মাসঊদ (রা.) বলেন-
إن أجمع آيةٍ في القرآن ِلـخيرٍ وشرٍّ هذه الآية
ভালো এবং মন্দ কাজের বিবরণ প্রদানে পবিত্র কুরআন শরীফের আয়াত সমূহের মধ্যে সর্বাধিক অর্থবহ আয়াত হলো এই আয়াত।
আদল বা ন্যায়পরায়নতা সর্ব ক্ষেত্রে রক্ষা করতে হবে। বিচারকার্য, ইবাদত, পারিবারিক জীবনসহ সকল ক্ষেত্রে আদল রক্ষা করতে হবে।
প্রিয়নবী (সা.)-এর জীবনে আমরা ন্যায়পরায়নতার উজ্জল দৃষ্ঠান্ত খুঁজে পাই। কুরাইশ বংশের এক সম্ভ্রান্ত মহিলার বিরুদ্ধে চুরির অভিযোগ আসল। অপরাধ প্রমাণিত হলে রাসূল (সা.) হাত কাটার নির্দেশ দিলেন। কোন কোন মহিলা হযরত আয়শা (রা.)-এর কাছে গেলেন এবং রাসূল (সা.)-এর কাছে অপরাধ মার্জনার সুপারিশ করতে বললেন। তিনি অপারগতা প্রকাশ করে বললেন উসামা বিন যায়দকে প্রেরণ কর। কারণ রাসূল (সা.) তাকে ও তাঁর বাবাকে খুব ¯েœহ করেন। উসামা (রা.) সুপারিশ করলে রাসূল (সা.) দৃঢ় কন্ঠে বললেন وأيمُ اللَّهِ ! لَو أنَّ فاطمةَ بنتَ محمَّدٍ سرَقَت لقطعتُ يدَها.
আল্লাহর কসম! যদি আমার মেয়ে ফাতিমাও চুরি করতো তাহলে আমি তাঁর হাত কেটে দিতাম। (সুবহানাল্লাহ)
এটাই হচ্ছে ন্যায়পরায়নতা, ইনসাফ। ইনসাফ রক্ষায় কোন স্বজনপ্রীতি নেই। আপন-পর সবাই সমান।
আরেকটি হাদীস বর্ণিত আছে যে, আমীরুল মুমিনীন হযরত আলী (রা.) এর খেলাফতকালে তার একটি যুদ্ধবর্ম হারিয়ে যায়। কিছুদিন পর তিনি সে বর্ম এক খৃস্টানের কাছে দেখতে পেলেন। আলী (রা.) এ বিষয়ে তার নিয়োগপ্রাপ্ত বিচারক শুরাই্হ (রা.)-এর কাছে বিচারপ্রার্থী হলেন। বিচারক শুরাইহ খৃস্টানকে বললেন আলী (রা.) যা বলছেন তা কি ঠিক? সে বলল বর্মটি আমার হাতে আর আমীরুল মুমিনীনকে আমি মিথ্যাবাদি বলতে পারিনা। তখন বিচারক শুরাইহ আলী (রা.) কে বললেন আপনার কথার পক্ষে কোন প্রমাণ আছে? তিনি বললেন না, আমার কাছে কোন প্রমান নেই। ইসলামী উসূল অনুযায়ী বিচারক খৃস্টানের পক্ষে রায় দিলেন। খৃস্টান লোকটি কয়েক পা এগিয়ে যাওয়ার পর ফিরে এস বলল এটাই হচ্ছে নবীদের ফয়সালা। এই বর্মটির মালিক আলী (রা.)। অতপর লোকটি কালিমা পড়ে মুসলমান হয়ে গেল।
এটা হচ্ছে সাহাবায়ে কিরামের আদর্শ। তাদের আদর্শ দেখে অমুসলিমগণ ইসলামের ছায়াতলে এসেছে। আলী (রা.) যদি জোর করে বর্মটি নিয়ে নিতেন তাহলে সে হয়ত মুসলমান হতো না।
এখানে লক্ষনীয়, হযরত আলী (রা.) নিজে খলীফা আর শুরাইহ তার নিয়োগপ্রাপ্ত বিচারক। শুরাইহ ন্যায়বিচার করেছেন। আলী (রা.) তার দাবীর পক্ষে প্রমাণ পেশ করতে পারেন নি। তাই ইনসাফ অনুযায়ী খলীফার পক্ষে রায় না দিয়ে খৃস্টানের পক্ষে রায় দেন। আলী (রা.)ও রায় মেনে নেন। এটাই ইসলামের ন্যায়পরায়নতা। বিচারের ক্ষেত্রে কোন স্বজনপ্রীতি নেই।
আমরা ইবাদতের ক্ষেত্রেও আদল ঠিক রাখবো। কোন প্রকার সীমা লঙ্ঘন করবো না। তিনজন সাহাবী আম্মাজান আয়শা (রা.)-এর কাছে রাসূল (সা.)-এর ইবাদত সম্পর্কে জানতে চাইলেন। তারপর তাদের একজন বললেন-আমি আর কোন রাত্রে ঘুমাব না, সারা রাত ইবাদত করব। অপরজন বললেন আমি এখনো বিয়ে করিনি, আর কোন দিন বিয়ে করব না বরং ইবাদত করব। আরেকজন বললেন আমি সারা জীবন রোযা রাখব।
রাসূল (সা.) শুনে অত্যন্ত রাগ করলন এবং বললেন- আমি নবী; রাত্রে ইবাদতও করি আবার নিদ্রা যাপনও করি, আমি বিবাহ-শাদীও করেছি, আমি রোযা রাখি আবার মাঝে মাঝে রোযা ছাড়ি।
এই হাদীসে রাসূল (সা.) এটাই বুঝালেন ইবাদতের ক্ষেত্রেও ন্যায়পরায়নতা রক্ষা করতে হবে। রাসূল (সা.) যে তরীকা প্রদর্শন করেছেন সে তরীকাতেই ইবাদত করতে হবে।
আপনি আপনার সন্তানাদির ক্ষেত্রেও ইনসাফ করতে হবে। একাধিক সন্তান থাকলে মীরাছের ক্ষেত্রে সমতা বজায় রাখতে হবে।
আমরা পাশ্চাত্য সভ্যতার ঘৃণ্যতাকে গ্রহণ করেছি। অথচ এই সভ্যতা আমাদের কিছুই দিতে পারে নি। গত কয়েক মাস আগে আমেরিকায় একজন কৃষাঙ্গ হত্যা করা হয়েছে শুধুমাত্র কালো হওয়ার অপরাধে। আমাদের নবী (সা.) চৌদ্দশত বছর আগে বলে গেছেন-
لَا فَضْلَ لِعَرَبِيٍّ عَلَى أَعْجَمِيٍّ ، وَلَا لِعَجَمِيٍّ عَلَى عَرَبِيٍّ ، وَلَا لِأَحْمَرَ عَلَى أَسْوَدَ ، وَلَا أَسْوَدَ عَلَى أَحْمَرَ إِلَّا بِالتَّقْوَى
আরবী-অনারবীদের মধ্যে কোন পার্থক্য নেই, শ্বেতাঙ্গ-কৃষাঙ্গের মধ্যে কোন পার্থক্য নেই।
হযরত বিলাল (রা.) হাবশী, কালো দাস ছিলেন। তিনি মুসলমান হওয়ার কারণে তপ্ত বালুকাময় মাঠে তার বুকে পাথর রেখে নির্যাতন করা হতো। আবূ বকর (রা.) তাকে ক্রয় করলেন এবং আযাদ করে দিলেন। রাসূল (সা.) হাবশী বিলালকে ্ইসলামের প্রথম মুআয্যিন নির্বাচন করলেন। এমনকি মক্কা বিজয়ের পর রাসূল (সা.) তাকে কা‘বার পিঠে তুলে আযান দিতে বললেন। ইসলামে সাদা-কালোর কোন পার্থক্য নেই। ইসলামে সবাই এক।
আয়াতের দ্বিতীয় নির্দেশ হলো-ইহসান। আরবী ইহসান শব্দটি হুসনুন থেকে এসেছে। হুসন অর্থ সৌন্দর্য। আমাদের জীবনের সকল কিছু সুন্দরভাবে করতে হবে। আমাদের প্রত্যেককে একজন মুসলিম হওয়ার পাশাপাশি একজন মুহসিন হতে হবে। আল্লাহ তা‘আলা ইরশাদ করেন- وأحسنوا إن الله يحب المحسنين
এক্ষেত্রে আমাদের অনুপম আদর্শ হচ্ছেন মুহসিনে আ‘যম হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম।
আমাদের নামায, আমাদের আচার-আচরণ, স্বভাব-চরিত্র সুন্দর্যমন্ডিত হওয়া উচিত। নামায সুন্দর হওয়ার ব্যাপরে রাসূল (সা.) ইরশাদ করেন-
الإحسانُ أن تعبد الله كأنك تراه فإن لم تكن تراه فإنه يراك
-তুমি এমনভাবে নামায পড় যেন আল্লাহ তা‘আলাকে দেখছ আর যদি দেখতে না পার তাহলে ধারণা রাখো আল্লাহ তোমাকে দেখছেন। আমাদের নামায যতো সুন্দর হবে আমাদের জীবন ততো উজ্জল হবে।
ইহসান বা দয়া দিয়ে মানুষ অনেক কিছু করতে পারে। প্রসিদ্ধ ঘটনা, এক জান্নাতী রমনীকে বিড়ালের সাথে দুর্ব্যবহার করার কারণে জাহান্নামে যেতে হয়েছে। আর এক ব্যভিচারিনী মহিলা কুকুরের প্রতি দয়া করে ঈমানদার হয়ে বেহেশতী হয়েছে।
আমরা রাসূল (সা.) এর জীবনে ইহসান বা দয়ার বিরল দৃষ্টান্ত পাই। হযরত যায়দ (রা.) দাস ছিলেন। উকায মেলায় ক্রয় করে আম্মাজান খাদিজা (রা.) কে তাঁর খালু উপহার দিয়েছিলেন। তিনি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর খেদমতে পেশ করেন। রাসূল (সা.) তাকে তাঁর পুত্রের মর্যাদা দান করেন। তখনও এই আয়াতটি নাযিল হয়নি-
مَّا كَانَ مُحَمَّدٌ أَبَا أَحَدٍ مِّن رِّجَالِكُمْ وَلَٰكِن رَّسُولَ اللَّهِ وَخَاتَمَ النَّبِيِّينَ ۗ وَكَانَ اللَّهُ بِكُلِّ شَيْءٍ عَلِيمًا
অনেক দিন পর তার স্বজনরা তার খোঁজ পেয়ে তার বাবা-চাচা রাসূল (সা.)-এর কাছে আসলেন। এসে বললেন আপনি যা চান আমরা দিতে রাজি আছি, বিনিময়ে আপনি আমাদের ছেলেকে দিয়ে দিন। রাসূল (সা.) তাদেরকে বললেন
ادعوه فخيراه فإن اختاركما فهو لكما بغير فداء وإن اختارني فو الله ما أنا بالذي أختار على من اختارني وقال زيد: والله يا رسول الله أنت مني بمنزلة الأب والعم وما أختار عليك أحداً قط)) فقال له والده: أتختار العبودية على الحرية وعلى أبيك وعمك يا زيد؟
তাকে ডাকেন এবং তার ইচ্ছার উপর ছেড়ে দিন। সে যদি আপনাদের সাথে যেতে চায় তাহলে কোন বিনিময় লাগবে না আমি তাকে দিয়ে দিব। আর যদি সে আমার কাছে থাকতে চায় তাহলে আল্লাহর কসম! যে আমার কাছে থাকতে চায় আমি তাকে রাখব। (যায়দ রা. কে জিজ্ঞেস করার পর) তিনি বললেন- ইয়া রাসূলাল্লাহ! আপনি-ই আমার বাবা, আপনি-ই আমার চাচা।
অতপর যায়দ (রা.)-এর বাবা বললেন- যায়দ! তুমি তোমার বাবা-চাচাকে ছেড়ে স্বাধীনতার পরিবর্তে পরাধিনতাকে গ্রহণ করলে?
রাসূল (সা.) শুধু মানুষকে দয়া করেন নি; জীন-ইনসান, পশু-পাখি, বৃক্ষ-লতাসহ সকল সৃষ্টির প্রতি দয়া ছিল অবারিত। রাসূল (সা.) ইরশাদ করেন- তোমরা যখন পশু কুরবানী করো তখনও উত্তমভাবে যবেহ করো, যে ব্যক্তি পশু কুরবানী করবে সে যেন তার ছুরি উত্তমভাবে ধারালো করে নেয়।
হযরত আবূ বকর (রা.) একদিন তার এক খাদিমকে একটু ধমক দিচ্ছিলেন, রাসূল (সা.) শুনে বললেন- খাদিমদের প্রতি এরূপ আচরণ আর সিদ্দীক এক সঙ্গে হতে পারে না।
সুতরাং আমরা মানুষের প্রতি দয়া করব, আল্লাহর সৃষ্ঠ জীবদের প্রতি দয়া করব। প্রিয়নবী (সা.) ইরশাদ করেন- তোমরা পৃথিবীবাসীর প্রতি দয়া করো, আকাশে যিনি আছেন তিনি তোমাদের দয়া করবেন। মহান আল্লাহ যেন আমাদের তাওফীক দান করেন। আমীন।
আল্লাহ তা‘আলা ইরশাদ করেন- كونوا مع الصادقينতোমরা সত্যবাদীদের সঙ্গী হও।
সে জন্যে আমরা আউলিয়ায়ে কেরামের দরবারে আসি। তাঁদের দরবারে আসলে, তাদের সঙ্গী হলে আমরা আল্লাহর পরিচয় লাভ করতে পারি। ওলী কারা? রাসূল (সা.) ওলীদের পরিচয় দানে বলেন- যাদেরকে দেখলে আল্লাহর কথা স্মরণ হয় তাঁরাই ওলী।
সোহবত বা সংস্পর্শের অনেক প্রভাব রয়েছে। একটি উদাহরণ দেই, আমরা যখন শিশুদের সাথে কথা বলি তখন আমাদের মধ্যে শিশু সুলভ আচরণ চলে আসে। আমরাও শিশুর সুরে ও স্বরে কথা বলি যা স্বাভাবিক কথা-বার্তায় চিন্তাও করতে পারি না। তখন আমরা একপ্রকার শিশু হয়ে যাই। তদ্রুপ ওলী আল্লাহদের কাছে আসলে আমাদের মন-মানসিকতা আল্লাহর দিকে ধাবিত হয়। তাদের আচরণ ও আমল দ্বারা আমরাও প্রভাবিত হই।
ইমাম শাফেঈ (র.) কোন সমস্যায় পড়লে ইমামে আযম আবূ হানীফা (র.)-এর মাযারে চলে যেতেন। সেখানে নামায পড়তেন, যিয়ারত করতেন। ইমাম শাফেঈ নামাযে রাফউল ইয়াদাইন এর পক্ষে। কিন্তু তিনি ইমাম আযমের কবরে গিয়ে নামাযে রাফউল ইয়াদাইন করতেন না। ইমাম আবূ হানীফার সম্মানের জন্য। সুতরাং আমরা ওলী আল্লাহদের সম্মানের প্রমাণ পাই ইমাম শাফেঈ (র.)-্এর আমল থেকে।
আর পবিত্র শুক্রবার দিনের কিছু আমল রয়েছে। হাদীস শরীফে এসেছে- যে ব্যক্তি শুক্রবার সূরা কাহ্ফ তিলাওয়াত করবে, পরবর্তী শুক্রবার পর্যন্ত তাকে নূর দান করা হবে। অনেকে জানতে চান সূরাটি কখন পড়া হবে। জুম‘আর পূর্বে পড়ে নেয়া ভাল। যদি না পারেন আসরের পূর্ব পর্যন্ত যে কোন সময় পড়ে নিতে পারেন।
আরেকটি হলো বেশি বেশি দুরূদ শরীফ পড়া। হাদীস শরীফে আছে রাসূল (সা.) ইরশাদ করেন- তোমরা শুক্রবার বেশি বেশি দুরূদ পড় কেননা তোমাদের দুরূদ আমার নিকট পৌছানো হয়। সাহাবায়ে কিরাম আরজ করলেন ইয়া রাসূলাল্লাহ! আপনি যখন কবরস্থ হবেন তখনও? রাসূল (সা.) জবাব দিলেন إن الله حرم على الأرض أن تأكل أجساد الأنبياء আল্লাহ তা‘আলা নবীগণের দেহ ভক্ষণ করা মাটির জন্যে হারাম করে দিয়েছেন।
রাসূল (সা.)-এর এই হাদীস বাতিল আকীদাকে খন্ডন করে। যারা হায়াতুন্নবীকে অস্বীকার করেন তাদের ভ্রান্ত আকীদা এই হাদীস দ্বারা খন্ডন করা হয়েছে। রাসূল (সা.) তাঁর কবরে স্বশরীরে জীবিত আছেন, এই কথা কাফেররাও স্বীকার করে। সে জন্যে তারা তাঁর লাশ মুবারক চুরির ষড়যন্ত্র করেছিল।
দুরূদ শরীফ যে পড়ে তার নাম, পিতৃপরিচয়সহ রাসূল (সা.)-এর দরবার হাজির করা হয়। ’দালাইলুল খায়রাত’, এবং ইবনুল জাওযীর ‘আল ওয়াফা’ কিতাবে আছে মুহব্বতের সহিত যে দুরূদ শরীফ পড়ে রাসূল (সা.) নিজ কান মুবারক দ্বারা তার দুরূদ শুনতে পান।
অনুলিখন- মাহমুদুল হাসান।

শুক্রবার, ২৭ মার্চ, ২০১৫

ইবনে তাইমিয়ার দৃষ্টিতে যঈফ হাদীসের উপর আমল করা জায়িয ও মুস্তাহাব

[মুফতী মাওলানা গিয়াস উদ্দিন চৌধুরী ফুলতলী’র ‘তাকলীদ-এর সুদৃঢ় রজ্জু’ থেকে]
গায়র মুকল্লিদগণ হাফিয ইবনে তাইমিয়ার অনুসরণ করেন বলে দাবি করেন অথচ ইবনে তাইমিয়া মৃতের তালকীন সম্পর্কে বলেন-
وروى في تلقين الميت بعد الدفن حديث فيه نظر، لكن عمل به رجال من أهل الشام الأولين، مع روايتهم له، فلذلك استحبه أكثر أصحابنا وغيرهم. (إقتضاء الصراط المستقيم)
অর্থাৎ মৃতের দাফনের পর তালকীন সম্পর্কে যে হাদীস বর্ণিত তার সনদ দুর্বল। কিন্তু পূর্বসুরী শামের আলিমগণ এর উপর আমল করেছেন। এ কারণে আমাদের অধিকাংশ লোকদের নিকট ও অন্যান্যদের নিকট তা মুস্তাহাব। (ইকতিদাউস সিরাতাল মুস্তাকীম)
ইবনে তাইমিয়ার উক্ত মন্তব্য থেকে প্রমাণিত হয় যে, হাদীসের সনদে দুর্বলতা থাকলেও অর্থাৎ হাদীস যঈফ হওয়া সত্ত্বেও তার উপর আমল করা জায়িয ও মুস্তাহাব।
হাফিয ইবনুল কাইয়্যিম আল জাওযীওالروح কিতাবে তালকীনকে মুস্তাহাব বলেছেন।
উল্লেখ্য, আল্লাহর রাসূলের হাদীস নয় এমন কোন উক্তিকে তাঁর উক্তি বলা প্রসঙ্গে যেমন ভয়ংকর পরিণতির কথা হাদীসে উল্লেখ রয়েছে তেমনি কোন হাদীসকে হাদীস না বলাও হাদীস অস্বীকার করার পর্যায়ে পড়ে যায়। বর্তমান সময়ে দেখা যায়, কেউ কেউ কোন কোন হাদীস উল্লেখের ক্ষেত্রে বিভিন্ন কৌশল অবলম্বন করে তা পরিত্যাগ করার সুযোগ অন্বেষন করেন। যেমন কোন হাদীস সম্পর্কে হাদীস বিশেষজ্ঞদের لا يصح (সহীহ নয়), لا يثبت (ছাবিত নেই) ইত্যাদি মন্তব্যকে তারা হাদীস প্রত্যাখ্যানের মাধ্যম হিসেবে গ্রহণ করেন। কিন্তু তাদের এ কৌশল তাদের মুর্খতার পরিচয় প্রদান করে। কারণ উসুলে হাদীসের পরিভাষায় এসব উক্তি হাদীস অগ্রহণযোগ্য হওয়ার দলীল নয়। আল্লামা আব্দুল হাই লখনবী (র.) তাঁর লিখিত কিতাবে এ প্রসঙ্গে বিশ্ববরেণ্য হাদীস বিশেষজ্ঞদের উক্তি উল্লেখ করেছেন। তিনি লিখেছেনÑ কোন কোন মুহাদ্দিসীনে কিরাম কোন হাদীস সম্পর্কেلا يصح (অসহীহ নয়) অথবা لايثبت (সাবিত নেই) মন্তব্য করেন। তা দেখে অনেক অজ্ঞ লোক এটাকে موضوع (মউযু) বা ضعيف (দুর্বল) বলে ধারণা করেন। এটি তাদের হাদীসের পরিভাষা সম্পর্কে অজ্ঞতার উপর ভিত্তিশীল। মোল্লা আলী কারী (র.)تذكرة الموضوعات কিতাবে লেখেন عدم ثبوت (সাবিত নেই) কথা দ্বারা হাদীস موضوع (মউযু) হওয়াকে আবশ্যক করে না।
হাফিয ইবনে হাজার (র.) الاذكار গ্রন্থের হাদীসের তাখরীজ সম্পর্কিত তদীয় نتائج الافكار কিতাবে লেখেন- ওযুতে বিসমিল্লাহ পড়া প্রসঙ্গে ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বল (র.) থেকে বর্ণিত যে, তিনি বলেছেন, আমি ওযূতে বিসমিল্লাহ পড়া সম্পর্কিত কোন হাদীস জানি না। আমি বলি, কারো না জানা বাস্তবে তা না থাকা সাবিত করে না। যদি তা মেনে নেওয়াও হয় তবুও সাবিত না থাকা যঈফ হওয়াকে সাবিত করে না। কারণ হতে পারেثابت (প্রমাণিত) দ্বারাصحيح (সহীহ) বুঝানো হয়েছে, তাহলে তা حسن (হাসান) হতে পারে। যদি তাও মেনে নেয়া যায়; তাহলেও প্রত্যেক فرد এর নফী দ্বারা পুরো বিষয়টি نفي (না বাচক) হয়ে যায় না।
নূর উদ্দীন সামহুদী الشرفين فضل فى العقدين جواهر এর মধ্যে বলেন: আশুরার দিনে পরিবার-পরিজনের জন্য বেশি বেশি খরচ করার হাদীস সম্পর্কে ইমাম আহমদ (র.)-এর উক্তি لا يصح (সহীহ নয়) দ্বারা তা বাতিল হয়ে যায় না। বরং এটি غير صحيح (সহীহ নয় এমন) হতে পারে যা দলীল হিসেবে গ্রহণের যোগ্য, যখন এটি ‘হাসান’ হবে। এর স্তর সহীহ ও যঈফ হাদীসের মধ্যখানে।
যরকশী نكت ابن الصلاح গ্রন্থে বলেন, আমাদের কথা موضوع (মউযু) ও لا يصح (সহীহ নয়) এর মধ্যে বিরাট পার্থক্য রয়েছে। কারণ প্রথমটি মিথ্যা হওয়া সাবিত করে অপরদিকে দ্বিতীয়টি সাবিত না থাকার সংবাদ দেয়। আর সাবিত না থাকা বাস্তবে না থাকা বুঝায় না। একথা এমন সকল হাদীসের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হবে যেগুলো সম্পর্কে ইবনুল জাওযী لا يصح (সহীহ নয়) বলেছেন।
মোল্লা আলী কারী বলেছেন সাখাবীর উক্তি لا يصح (সহীহ নয়) যঈফ ও হাসানকে নফী করে না।
যুরকানী বলেন- আল্লামা কাসতালানী (র.) ইবনে রজব থেকে বর্ণনা করেন যে, ইবনে হিব্বান একে সহীহ বলেছেন। এতে ইবনে দেহইয়ার সেই বক্তব্য প্রত্যাখ্যান করা হয়েছে যাতে তিনি বলেছিলেন- ‘শাবানের মধ্যরাতের ফযীলত সম্পর্কে কোন সহীহ হাদীস নেই।’ যদিও তিনি সহীহ দ্বারা পারিভাষিক সহীহ বুঝিয়েছেন। কারণ মু‘আয (রা.)-এর হাদীস সহীহ নয় বরং হাসান। (আর রাফউ ওয়াত তাকমীল ফিল জারহি ওয়াত তা‘দীল, পৃষ্ঠা ১৯১-১৯৭)

রবিবার, ১৫ মার্চ, ২০১৫

শাফাআত

মুহাম্মদ মাহমুদুল হাসান

হাশরের মাঠে গোনাহগারদের জন্য রাসূল (সা.) ও নেক্কার উম্মতগণের শাফাআত হাদীসে মাশহুর দ্বারা প্রমাণিত। খারেজী, মুতাযিলাসহ কিছু ভ্রান্ত দল শাফাআতকে অস্বীকার করেন। খারেজীদের বক্তব্য হলো কবীরা গোনাহকারী কাফির। আর কাফিরদের জন্য জাহান্নাম অবধারিত। মু’তাযিলারা শাফা’আতকে অন্যভাবে ব্যাখ্যা দিয়ে থাকেন। তাদের দৃষ্টিতে শাফাআত হলো নেক্কারদের মর্যাদা বৃদ্ধির জন্য। শাফাআতের মাধ্যমে গুনাহগারদেরকে জাহান্নাম থেকে মুক্তি দেওয়া অসম্ভব। বর্তমানে নব্য কিছু দল মুতলাকান গোনাহগারদের জন্য রাসূল (সা.)-এর শাফাআতকে অস্বীকার করেন। আহলে সুন্নাত ওয়াল জামা‘আতের আকীদা হলো কিয়ামতের দিন রাসূল (সা.) সহ অন্যান্য নেক্কারগণ এমন গুনাহগার উম্মতের জন্য শাফাআত করবেন, যাদের উপর জাহান্নাম অবধারিত। সুনানে ইবনে মাজাহ-তে হযরত উসমান (রা.) থেকে বর্ণিত আছে, রাসূল (সা.) ইরশাদ করেছেন- কিয়ামতের দিন তিন শ্রেণীর লোক শাফা‘আত করবেন। নবীগণ, আলিমগণ এবং শহীদগণ।
শাফাআতের সর্বোচ্চ স্তর হলো শাফাআতে কুবরা। এটি রাসূল (সা.)-এর জন্য নির্দিষ্ঠ। কিয়ামতের ভয়াল মাঠের ভিষন কষ্ঠ থেকে সমস্ত মাখলূককে মুক্তি দিয়ে বিচারকার্য শুরু করার জন্য মহান আল্লাহর দরবারে রাসূল (সা.) সুপারিশ করবেন। এই শাফাআত সম্পর্কে বুখারী শরীফে বর্ণিত আছে, রাসূল (সা.) ইরশাদ করেছেন- যখন কিয়ামতের দিন লোকেরা সমুদ্রের ঢেউ-এর মতো পেরেশান হয়ে যাবে তখন তারা আদম (আ.)-এর কাছে আসবে এবং বলবে, আপনি আপনার রবের কাছে আমাদের জন্য শাফাআত করুন। তিনি বলবেন আমি এর উপযুক্ত নই, তোমরা ইবরাহীম (আ.)-এর কাছে যাও; তিনি আল্লাহর খলীল। এরপর সবাই ইবরাহীস (আ.)-এর কাছে এসে শাফাআতের জন্য আরজ করবে। তিনি বলবেন আমি এর উপযুক্ত নই, তোমরা মূসা (আ.)-এর কাছে যাও। কেননা তিনি কালীমুল্লাহ। এরপর লোকের তার কাছে আসবে এবং শাফাআতের আবেদন করবে। তিনি বলবেন- আমি এর উপযুক্ত নই। তোমরা ঈসা (আ.)-এর কাছে যাও, কেননা তিনি রূহুল্লাহ ও কালিমাতুল্লাহ। এরপর লোকেরা ঈসা (আ.)-এর কাছে আসবে এবং শাফাআতের আরজ করবে। তিনিও বলবেন আমি এর উপযুক্ত নই, তোমরা হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর নিকট যাও। 
এরপর সবাই আমার নিকট আসবে এবং মহান আল্লাহর কাছে শাফাআতের জন্য বলবে। আমি বলব হ্যাঁ! আমি এই কাজের উপযুক্ত। অতপর আমি আমার রবের দরবারে অনুমতি চাইব, আমাকে অনুমতি দেওয়া হবে। এরপর আমার অন্তরে কিছু প্রশংসামূলক শব্দ তৈরী  করে দেওয়া হবে যার মাধ্যমে আমি আমার রবের প্রশংসা করব। তারপর আমি মহান আল্লাহর দরবারে সিজদায় অবনত হব। এরপর আমাকে বলা হবে-
 يا محمد! ارفع رأسك وقل يسمع لك وسل تعط واشفع تشفع، فأقول رب أمتي أمتي
হে মুহাম্মদ (সা.)! আপনার মাথা তুলুন। আপনি বলুন আপনার কথা শুনা হবে, আপনি চান আপনাকে প্রদান করা হবে, আপনি শাফাআত করুন আপনার শাফাআত কবূল করা হবে। তখন আমি বলব- হে আমার রব! আমার উম্মত, আমার উম্মত।
বুখারী শরীফে অপর হাদীসে রাসূল (সা.)-এর এই বিশেষ সম্মানকে “মাকামে মাহমূদ” বলা হয়েছে।
এই শাফাআত আমাদের নবীর জন্য খাস বা নির্দিষ্ঠ। 

রাসূল (সা.) কিয়ামতের দিন তার উম্মতের মধ্যে যারা জাহান্নামী তাদের মুক্তির জন্য শাফাআত করবেন। ইবনে মাজাহ ও মুসনদে আহমদে হযরত আবূ মূসা আশআরী (রা.) হতে বর্ণিত আছে বর্ণিত আছে, রাসূল (সা.) ইরশাদ করেন- আমাকে শাফাআত এবং আমর অর্ধেক উম্মতকে (বিনা হিনাবে) বেহেশতে প্রবেশ করানোর ব্যপারে স্বাধীনতা দেওয়া হয়েছিল। আমি শাফাআত করাকে গ্রহণ করেছি, কেননা এটা অধিক ব্যাপত এবং যথেষ্ট হবে। তোমরা মনে করো না শাফাআত শুধুমাত্র মুত্তাকীদের জন্য। বরং ইহা গুনাহগার, পাপী ও অপরাধীদের জন্য।
তিরমিযী শরীফে হযরত আনাস (রা.) হতে বর্ণিত হয়েছে-
قال رسول الله صلي الله عليه وسلم شفاعتي لأهل الكبائر من أمتي
আমার উম্মতের মধ্যে কবীরা গুনাহকারীদের জন্য আমার শাফাআত।
মুসনাদে আহমাদে হযরত আবূ দারদা (রাদ্বি.) হতেও অনুরূপ বর্ণনা আছ্।ে

অন্যান্য নবীগণের শাফাআত
ইবনে মাজাহ ও বায়হাকীতে হযরত জাবির (রাদ্বি.) হতে বর্ণিত রাসূল (সা.) ইরশাদ করেন- যখন জান্নাতী ও জাহান্নামীদের মধ্যে পার্থক্য করা হবে তখন জান্নাতীরা জান্নাতে ও জাহান্নামীরা জাহান্নামে প্রকেশ করবে। এরপর রাসূলগণ দাঁড়াবেন এবং (জাহান্নামীদের জন্য) শাফাআত করবেন। রাসূলদেরকে বলা হবে আপনারা যান, এবং যাদেরকে চিনেন তাদেরকে (জাহান্নাম) থেকে বের করে আনেন। অতপর রাসূলগণ এমন কিছু লোকদেরকে জাহান্নাম থেকে বের করে আনবেন যারা আগুনে জ্বলে ছাই হয়ে গেছে। তাদেরকে নদীতে নিক্ষেপ করা হবে এবং সাদা ক্কড়ার মতো হয়ে বের হবে।............................ অবশেষে যাদের অন্তরে সরিষার দানা পরিমাণ ঈমান থাকবে তাদেরকে রাসূলগণ শাফাআত করে জাহান্নাম থেকে বের করে জান্নাতে নিবেন। তাদের গর্দানে লিখা থাকবে عتاء الله  মহান আল্লাহ কর্তৃক মুক্ত।
মুসনাদে আহমদ ও তাবারানীতে বর্ণিত আছে- রাসূল (সা.) ইরশাদ করেন মহান আল্লাহ যাকে ইচ্ছা তাকে মুক্তি প্রদান করবেন। অতপর ফিরিশতা, নবীগণ, সিদ্দিকীন ও শহীদগণকে শাফাআতের অনুমতি দিবেন।

আউলিয়াদের শাফাআত
তিরমিযী শরীফে হযরত আবূ সাঈদ খুদরী (রা.) হতে বণিূত রাসুল (সা.) ইরশাদ করেন- আমার উম্মতের মধ্যে কিছু লোক আছেন যারা তাদের সমর্থক ও অনুসারীদের শাফাআত করবেন। কিছু লোক আছেন যারা তাদের গোত্রের জন্য শাফাআত করবেন, আর কিছু লোক আছেন যারা একটি দলের জন্য শাফাআত করবেন। আর কিছু লোক আছেন যারা একক জনের জন্য শাফাআত করবেন, এভাবে সবাই জান্নাতে যাবে।

হাফিযে কুরআনদের শাফাআত
তিরমিযী শরীফে হযরত আলী (রা.) হতে বর্ণিত রাসূল (সা.) ইরশাদ করেন- যে ব্যক্তি কুরআন শরীফ পাঠ করল এবং হিফয করল, আল্লাহ তাকে জান্নাতে প্রবেশ করা্েবন এবং তার বংশধর থেকে এমন দশজনকে তার শাফাআতে জান্নাতে দিবেন যাদের উপর জাহান্নাম অবধারিত। 

শুক্রবার, ১৩ মার্চ, ২০১৫

আল কুরআনের অনন্য খাদিম

খায়রুল হুদা খান

আল্লামা ফুলতলী ছাহেব কিবলাহ (র.) একটি নাম, একটি ইতিহাস। তিনি ইসলামের বহুমাত্রিক খিদমতের এক মহাপুরুষ, যিনি তাঁর দীর্ঘ কর্মময় জীবনের প্রতিটি মুহূর্ত কাজ করে গেছেন দীনের তরে, ইসলামের তরে, সমাজের মানুষের উন্নতির লক্ষ্যে। তাঁর জীবন পর্যালোচনা করলে দেখা যায় মানুষের কল্যাণ হতে পারে এমন কোন ক্ষেত্র নেই, যাতে তিনি সময় এবং প্রচেষ্টা ব্যয় করেন নি। খিদমতে খালক তথা সৃষ্টির সেবা, মানবসেবা, ইসলাম প্রচার, দীনের খিদমত, কুরআনের খিদমত, হাদীসের খিদমত, অসত্য-অন্যায়ের বিরুদ্ধে সংগ্রাম, সৎকাজে মানুষকে উৎসাহিত করণ, সুসাহিত্য চর্চা ইত্যাদি মানব কল্যাণের সকল ক্ষেত্রে রয়েছে তাঁর সরব পদচারণা। তাঁর এসকল খিদমতের একেকটির বর্ণনা দিয়ে এক একটি গ্রন্থ রচনা সম্ভব। আলোচ্য নিবন্ধে আল্লামা ফুলতলী ছাহেব কিবলাহ’র কুরআনের খিদমত সংক্ষেপে তুলে ধরার চেষ্টা করা হয়েছে।
আল্লামা ফুলতলী ছাহেব কিবলাহ (র.) কুরআনের খিদমত করেছেন নানাভাবে। কুরআনের খিদমতে তাঁর সবচেয়ে বড় অবদান হচ্ছে কুরআন পাকের সহীহ তিলাওয়াত শিক্ষা প্রদান। ছাহেব কিবলাহ এমন এক সময় তাঁর এই খিদমত আরম্ভ করেন যখন এই উপমহাদেশে কুরআন তিলাওয়াতে নানা অসামঞ্জস্যতা দেখা দিয়েছিল। কুরআনের হরফ বিকৃতি, ভুল উচ্চারণসহ অনেক ধরনের ভ্রান্তি ছড়িয়ে পড়েছিল। এমনি সময়ে আল্লামা ফুলতলী ছাহেব কিবলাহ পবিত্র কুরআনের বিশুদ্ধ তিলাওয়াত শিক্ষা দিতে আত্মনিয়োগ করেন। আল্লামা ছাহেব কিবলাহ’র নিরলস প্রচেষ্টা ও আন্দোলনে উপমহাদেশের মানুষ আজ কুরআনের সঠিক তিলাওয়াত করার সৌভাগ্য অর্জন করেছে।
হযরত ছাহেব কিবলাহ ভারতের উত্তর প্রদেশের ঐতিহ্যবাহী রামপুর আলিয়া মাদরাসা থেকে হাদীস, তাফসীর ও ফিকহ বিষয়ে উচ্চতর শিক্ষা গ্রহণ করে বর্তমানে ভারতের আসাম রাজ্যের করিমগঞ্জ জেলার বদরপুর আলিয়া মাদরাসায় যখন শিক্ষকতায় নিয়োজিত, তখন তাঁর মুরশিদ হযরত মাওলানা আবূ ইউসুফ শাহ মোহম্মদ ইয়াকুব বদরপুরী (র) তাঁকে বিশুদ্ধ কিরাত শিক্ষার ব্যাপারে বিশেষ তাকীদ প্রদান করেন। উল্লেখ্য, হযরত বদরপুরী (র.) উলামায়ে কিরামকে কিরাত বিশুদ্ধ করার জন্য তাকীদ দিতেন। কিরাত শুদ্ধ না হলে নামায শুদ্ধ হয় না, আর নামায বিশুদ্ধ না হলে কোন ইবাদতই কবূল হয় না, তাই কিরাত শুদ্ধ করা প্রত্যেকের জন্য জরুরী। উলামা সাধারণের প্রতি বদরপুরী ছাহেব কিবলাহর এ ছিল এক বিশেষ নসীহত। ফুলতলী ছাহেব কিবলাহর কিরাতে বদরপুরী ছাহেব সন্তুষ্ট ছিলেন, কারণ ছাহেব কিবলাহ স্বীয় মুরশিদ বদরপুরী (র)-এর খিদমতেই কিরাতের তালীম নিয়েছিলেন। হযরত বদরপুরী (র.) কেবল আলিম ও পীর ছিলেন না; বরং সনদপ্রাপ্ত কারীও ছিলেন। তাঁর কিরাতের উস্তাদ হলেন হযরত শায়খ মাওলানা আদুল মজিদ (র.), তিনি সনদ লাভ করেছিলেন হযরত শায়খ মাওলানা আব্দুল ওহাব সিলেটী (র.)-এর কাছ থেকে। তাঁর সনদের সিলসিলা আবূ আমরিদ্দানী (র.) হয়ে রাসূলে কারীম (সা.) পর্যন্ত পৌঁছেছে। হযরত বদরপুরী (র.) ফুলতলী ছাহেব কিবলাহকে কিরাতে আরও মাহির হওয়ার জন্য নির্দেশ দিলেন। কারণ তিনি বুঝতে পেরেছিলেন অদূর ভবিষ্যতে ফুলতলী ছাহেবকে ইলমে কিরাতের মহান খিদমতের এক গুরুদায়িত্ব আনজাম দিতে হবে। আর তজ্জন্য তাঁকে অর্জন করতে হবে এই বিষয়ে আরও উচ্চতর সমৃদ্ধি।
মুরশিদ কিবলাহর নির্দেশ পেয়ে তিনি হযরত মাওলানা হাফিয আব্দুর রউফ করমপুরী (র.)-এর নিকট উপস্থিত হয়ে তাঁর কাছে পর্যায়ক্রমে সমস্ত কুরআন শরীফের তিলাওয়াত শুনিয়ে সনদ লাভ করেন। হযরত মাওলানা আব্দুর রউফ করমপুরী (র.) শৈশবকাল থেকে ২৯ বছর পর্যন্ত পিতা-মাতার সাথে মক্কা শরীফে অবস্থান করে ইলমে কিরাত শিক্ষা করেন এবং কুরআন শরীফ হিফয করেন। ইলমে কিরাতে তাঁর উস্তাদ ছিলেন বিশ্ববিখ্যাত কারী ইরকসূস মিসরী (র.)। হযরত ইরকসূস মিসরী (র.) থেকে রাসূল (সা.) পর্যন্ত সনদের ধারাবাহিতা এখানে উল্লেখ করা হল। ৩) হযরত ইরকসূস মিসরী (র.), ৪) শায়খুল কুররা হযরত আবদুল্লাহ আল মক্কী (র.), ৫) হযরত কারী ইবরাহীম সা’দ মিসরী (র.), ৬) হযরত হাসান বাদবার শাফিঈ (র.),  ৭) হযরত মুহাম্মদ আল মুতাওয়াল্লী (র.), ৮) হযরত সায়্যিদ আহমদ তিহামী, ৯) হযরত আহমদ সালমুনা, ১০) হযরত ইবরাহীম আল ‘উবায়দী, ১১) হযরত আবদুর রহমান আল আজহুরী, ১২) হযরত শায়খ আহমদ আল বাকারী, ১৩) হযরত শায়খ মুহাম্মদ আল বাকারী, ১৪) হযরত আবদুর রহমান আল ইয়ামনী, ১৫) হযরত শায়খ শাখ্খাজা, ১৬) হযরত শায়খ আবদুল হক ছানবাতী, ১৭) হযরত শায়খুল ইসলাম জাকারিয়া আল আনসারী, ১৮) হযরত শায়খ দেওয়ান আল আকারী, ১৯) হযরত শায়খ মুহাম্মদ আননাওয়েরী, ২০) হযরত ইমাম মুহাম্মদ আল জাযারী, ২১) হযরত শায়খ ইবনুল লাব্বান, ২২) হযরত শায়খ আহমদ ছিহরা আশশাতবী, ২৩) হযরত শায়খ আবুল হাসান আলী ইবনে হুদাইল, ২৪) হযরত শায়খ আবূ দাঊদ সুলায়মান ইবনে নাজ্জাহ, ২৫) হযরত ইমাম আবূ আমরিদ্দানী, ২৬) হযরত আবুল হাসান তহির ইবনে গালিউন, ২৭) হযরত সালিহ আল-হাশিমী, ২৮) হযরত আহমদ আল উশনানী, ২৯) হযরত মুহাম্মদ ‘উবায়দ আল সাব্বাহ, ৩০) হযরত ইমাম হাফস (র.), ৩১) হযরত ইমাম আছিম ইবন আবুন নুজদ আল কূফী, ৩২) হযরত আবূ আব্দিল্লাহ ইবনে হাবিব আস সালামী ও যুর ইবনে হাবিশ, ৩৩) আমীরুল মু’মিনীন হযরত উসমান (রা.) ও হযরত আলী (রা.), হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে মাসঊদ (রা.), হযরত উবাই ইবনে কা’ব (রা.), হযরত যায়দ ইবনে সাবিত (রা.), ৩৪) সাইয়িদুল মুরসালীন, শাফিউল মুযনিবীন, মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম, হযরত জিবরীল (আ.)-এর মাধ্যমে মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামীনের লাওহে মাহফুয থেকে। (সূত্র : আল-কাউলুছ হাদীছ)
১৯৪৪ইং (১৩৫১ বাংলা) সনে হযরত ফুলতলী ছাহেব কিবলাহ মক্কা শরীফে যান এবং কিরাতের আরো উচ্চ শিক্ষা গ্রহণ করেন মিসরীয় বংশোদ্ভূত রাঈসুল কুররা হযরত আহমদ হিজাযী (র.)-এর নিকট থেকে। তিনি ছিলেন হারাম শরীফের ইমামগণের পরীক্ষক ও মক্কা শরীফের ফকীহ। তিনি যে কারী ছাহেবের কিরাত বিশুদ্ধ বলে অনুমোদন করতেন তাকেই হারাম শরীফে কিরাত পাঠ করার  অনুমতি দেয়া হত। হযরত ফুলতলী ছাহেব কিবলাহ তাঁর নিকট উপস্থিত হয়ে কিরাত শুনানোর অনুমতি প্রার্থনা করলে তিনি ছাহেব কিবলাহ ভারত থেকে এসেছেন জানতে পেরে তাঁর কিরাত শুনতে অস্বীকৃতি জ্ঞাপন করলেন। কারণ তৎকালীন সময়ে ভারতে বিশুদ্ধ তিলাওয়াত ছিল না বললেই চলে। ছাহেব কিবলাহ জানালেন তিনি হযরত হাফিয মাওলানা আব্দুর রউফ করমপুরী (র.)-এর নিকট কিরাত শিক্ষা করেছেন যিনি ইরকসুস মিসরী (র.)  এর ছাত্র। আহমদ হিজাযী (র.) করমপুরী (র.)-কে চিনতে না পারলেও ইরকসূস মিসরী (র.)-কে চিনতে পারলেন এবং ছাহেব কিবলাহ’র কিরাত শুনতে সম্মত হলেন। হযরত আহমদ হিজাযী (র.) কিরাতের সনদ লাভ করেছিলেন হযরত আহমদ আদ-দারদীর (র.)-এর কাছ থেকে। তিনি সনদ লাভ করেছিলেন হযরত আযহার শরীফ (র.)-এর কাছ থেকে। তাঁরও সনদ হযরত আবূ আমরিদ্দানী (র.) হয়ে রাসূল (সা.) পর্যন্ত পৌঁছেছে। আল্লামা ফুলতলী ছাহেব কিবলাহ’র অনন্য সাধারণ গুণাবলী বা বৈশিষ্ট্যাবলীর মধ্যে একটি ছিল শিক্ষা জীবনে মাত্র ১৮ বছর বয়সে স্বীয় মুরশিদ থেকে তরীকতের খিলাফত লাভ আর অন্যটি ছিল রাঈসুল কুররা আহমদ হিজাযী (র.)-এর ভারত উপমহাদেশের প্রথম এবং একমাত্র সনদ প্রাপ্ত ছাত্র হওয়ার সৌভাগ্য অর্জন করা। সনদ প্রদান করে হযরত আহমদ হিজাযী (র.) ফুলতলী ছাহেব কিবলাহকে ওসীয়ত করে বললেন, ‘এটা একটি আমানত, যে আমানত আমার ইলমে কিরাতের উস্তাদ ও বুযুর্গগণ আমার হাতে রেখেছিলেন। আজ আমি তা তোমার হাতে সোপর্দ করলাম। যদি এই আমানতের হ্রাস-বৃদ্ধিজনিত খেয়ানত কর, তবে তার পরিণাম ফল তুমিই ভোগ করবে। কারণ আজমে (আরব ছাড়া অন্যান্য দেশ) এখন হরফের উচ্চারণ ও পঠন পদ্ধতি বিষয়ে নানারকম মতভেদ দেখা দিয়েছে।’
ফুলতলী ছাহেব কিবলাহ মক্কা শরীফ হতে ফিরে পুনরায় যথারীতি বদরপুর আলিয়া মাদরাসায় শিক্ষাদান শুরু করেন। একদিন হযরত ছাহেব কিবলাহ ক্লাসে ছাত্রদের দারস দেয়ার সময় সেখানে হযরত মাওলানা আব্দুন নূর গড়কাপনী (র.) তাশরীফ নিলেন। সমকালীন খ্যাতনামা আলিম ও বুযুর্গ ছিলেন তিনি । ফুলতলী ছাহেব কিবলাহ তাঁকে সমাদরে পাশে বসতে অনুরোধ করে পাঠদানে ব্যস্ত হলেন।  ক্লাসের সময় শেষ হলে ছাহেব কিবলাহ তাঁর কুশলাদি ও আসার কারণ জানতে চাইলে তিনি  বললেন, সর্বসাধারণ তো দূরের কথা এতদঞ্চলের বেশ সংখ্যক আলিমেরও কিরাত শুদ্ধ নয় । তাই ছাহেব কিবলাহ দারসে কিরাতের জন্য অন্তত সপ্তাহে এক ঘণ্টা সময় যেন দেন আমাদের। ফুলতলী ছাহেব কিবলাহ জবাবে বললেন, আমার হাতে সময় একেবারে কম, বিশেষ করে ক্লাসে ছাত্রদের পাঠদানের আগে নিজে ভালোভাবে তা দেখে নিতে হয়, তাই সময় দেয়া মোটেই সম্ভব নয়। এ কথার পর আব্দুন নূর ছাহেব চলে গেলেন। 
পরদিন ঠিক একইভাবে উপস্থিত হয়ে এ কথারই পুনরাবৃত্তি করলে ছাহেব কিবলাহ আবারও অপারগতা প্রকাশ করলেন। তখন হযরত আব্দুন নূর (র.) বললেন, আমি নিজে থেকে আপনার নিকট আসিনি। বড় জায়গা থেকে নির্দেশ পেয়েই তবে আপনার শরণাপন্ন হয়েছি। ফুলতলী ছাহেব কিবলাহ তখন স্বীয় মুরশিদ হযরত বদরপুরী (র.) এর নির্দেশ কিনা জানতে চাইলে হযরত আব্দুন নূর (র.) বললেন, না আরো বড় জায়গা থেকে নির্দেশ পেয়েছি। ছাহেব কিবলাহর পীড়াপীড়িতে তিনি বর্ণনা করলেন, আমি স্বপ্নে হুযূর (সা.)-এর দীদার লাভ করি। হুযূর (সা.)-এর কন্ঠে সুললিত তিলাওয়াতে কালামে পাক শুনতে পাই। আরয করলাম, ইয়া রাসূল্লাল্লাহ (সা.), এই কিরাত কিভাবে শিখব? তখন নবী পাক (সা.) ডান দিকে যাকে ইশারা করলেন, চেয়ে দেখি সেই সৌভাগ্যবান আপনি। একথা শোনার সাথে সাথে হযরত আল্লামা ফুলতলী ছাহেব কিবলাহ কেঁদে ফেললেন এবং তাঁকে জড়িয়ে ধরে বললেন, ঠিক আছে আমি সপ্তাহের প্রতি বৃহস্পতিবার ১২টার পরে নিকটবর্তী হযরত আদম খাকী (র.)  (তিনশত ষাট আউলিয়ার অন্যতম)-এর মাযার সংলগ্ন মসজিদে কিরাতের দারস দেওয়ার ওয়াদা দিলাম। এভাবেই ছাহেব কিবলাহর ইলমে কিরাতের খিদমতের সূত্রপাত। তিনি বিভিন্ন অঞ্চলে পায়ে হেটে, ঘোড়ায় চড়ে, দীর্ঘ পথ অতিক্রম করে অবৈতনিকভাবে কিরাতের দারস দিয়েছেন। যখনই যে অঞ্চলে যেতেন স্থানীয় উলামা-মুদাররিসীন কিরাত শিক্ষার জন্য জমায়েত হয়ে যেতেন। ছাহেব কিবলাহ ধৈর্য সহকারে তাদেরকে কিরাতের মশক দিতেন। ফলে সিলেট ও আসাম অঞ্চলের খ্যাতনামা আলিমগণ তাঁর নিকট থেকে বিশুদ্ধ কিরাত শিক্ষা করে উপকৃত হয়েছেন। ভারত বিভক্তির পর সিলেট জেলার জকিগঞ্জ উপজেলার বারগাত্তা, কানাইঘাট উপজেলার গাছবাড়ি আলিয়া মাদরাসা ও বিশ্বনাথের সৎপুর আলিয়া মাদরাসায় কিরাত শিক্ষা দিয়েছেন।
১৯৫০ ইংরেজি সনে ছাহেব কিবলাহ নিজ বাড়িতে ইলমে কিরাতের দারস প্রথম চালু করেন। বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের ছাত্র ও শিক্ষকদের সুবিধার্থে ছুটির অবসরকালীন রামাদান মাসকে কিরাত শিক্ষার জন্য বেছে নেয়া হয়। আর রামাদান মাস যেহেতু নুযূলে কুরআনের মাস, তাই প্রতি বৎসর রামাদানে ছাহেব কিবলাহ নিজ বাড়িতে শিক্ষার্থী আলিমদের থাকা খাওয়ার ব্যবস্থা নিজ খরচে বহন করতে থাকেন। শিক্ষার্থীদের থাকা-খাওয়া, রান্না-বান্না সবকিছু নিজে তদারকি করতেন। এমনকি নিজে রান্না করে খাইয়েছেন শিক্ষার্থীদেরকে। পঞ্চাশ হতে একশত এভাবে দিন দিন শিক্ষার্থীর সংখ্যা বৃদ্ধি পেতে থাকে। তিনি সকলকে তালীম দিয়ে এবং সমগ্র কুরআন শরীফ নিজে শুনে প্রয়োজনীয় সংশোধনী করে তবেই সনদ প্রদান করতেন। পরবর্তী সময়ে শিক্ষার্থীদের সংখ্যা দিন দিন বাড়তে থাকায় অন্যান্য স্থানে শাখাকেন্দ্র অনুমোদন ও একটি বোর্ড গঠনের প্রয়োজনীয়তা দেখা দেয় এবং ৭ সদস্য বিশিষ্ট ট্রাস্টি বোর্ড গঠন করা হয়। বোর্ডের সদস্যদের অনুরোধক্রমে ছাহেব কিবলাহর ওয়ালিদ মুহতরম হযরত মাওলানা মুফতী আব্দুল মজিদ চৌধুরী মুজাদ্দেদী বরকতী (র.)-এর নামানুসারে এই প্রতিষ্ঠানের নাম রাখা হয় ‘দারুল কিরাত মজিদিয়া ফুলতলী ট্রাস্ট’। হযরত ছাহেব কিবলাহ শুরু থেকেই ছিলেন এ বোর্ডের চেয়ারম্যান। বর্তমানে ট্রাস্টি বোর্ডের অধীনে কেন্দ্রীয় দপ্তর বা বোর্ড অফিস ফুলতলী ছাহেব বাড়ি থেকে বাংলাদেশ ও বহির্বিশ্বে কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে। নিজস্ব বিল্ডিং থেকে বছরব্যাপী এর প্রস্তুতি চলতে থাকে। বোর্ডের জেনারেল সেক্রেটারি হিসেবে এ পর্যন্ত দক্ষতা ও আন্তরিকতার সাথে অবৈতনিকভাবে দায়িত্ব পালন করে আসছেন তাঁরই বড় ছাহেবজাদা হযরত আল্লামা ইমাদ উদ্দিন চৌধুরী বড় ছাহেব কিবলাহ ফুলতলী। ছাহেব কিবলাহ তাঁর ভূ-সম্পত্তির বিশাল অংশ (প্রায় ৩৩ একর) এই ট্রাস্টের নামে ওয়াকফ করে দিয়েছেন। ছাহেব কিবলাহর জীবদ্দশায়ই এই বোর্ডের নিয়ন্ত্রণাধীন প্রায় এক হাজার শাখা কেন্দ্র বাংলাদেশ, ভারত, যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্রসহ বিভিন্ন দেশে ছড়িয়ে পড়েছে। এ সকল শাখার মাধ্যমে প্রতি বছর রামাদানে বিশুদ্ধ কুরআন শিক্ষা লাভ করে থাকে হাজার হাজার শিক্ষার্থী। ফুলতলী ছাহেব বাড়িতে অবস্থিত ট্রাস্টের কেন্দ্রীয় দপ্তর থেকে সকল শাখার কার্যক্রম পরিচালিত হয়ে থাকে। তাছাড়া প্রতি রামাদানে বোর্ডের সর্বশেষ জামাত ‘ছাদিছ’-এর পাঠদান ফুলতলী ছাহেব বাড়িতে অবস্থিত প্রধানকেন্দ্রে পরিচালিত হয়। হাজার হাজার ছাত্র মাসব্যাপী এখানে অবস্থান করে আল্লামা ফুলতলী ছাহেব কিবলাহ’র নিকট থেকে ইলমে কিরাতের দারস গ্রহণ করেছেন। লাভ করেছেন পরিপূর্ণতার সনদ। সনদপ্রাপ্ত কারীসাহেবগণ দেশ-বিদেশে ছড়িয়ে দেন বিশুদ্ধ তিলাওয়াতের সুর। এত বিশাল সংখ্যক মানুষ কোন এক ব্যক্তির কাছে বিশুদ্ধ কুরআন তিলাওয়াত শিখতে পেরেছে এমন নযীর পৃথিবীতে হয়তো দ্বিতীয়টি নেই।
ইন্তিকালের পূর্ব পর্যন্ত ছাহেব কিবলাহ প্রতি রামাদান মাসে নিজ বাড়ি ফুলতলীতে অবস্থান করে আগত হাজার হাজার শিক্ষার্থীকে নিয়মিত কিরাত প্রশিক্ষণ দিয়েছেন। ক্লান্তিহীন, শ্রান্তিহীন ছিল তাঁর এই খিদমত। প্রতিদিন সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত কিরাত প্রশিক্ষণ দিতেন। বাদ যুহর কিছুক্ষণ তাফসীর বয়ান করতেন। রামাদান ছাড়াও সপ্তাহে দু’দিন শনি ও রবিবার বাদ যুহর ছাহেব বাড়ি জামে মসজিদে ফুলতলী কামিল মাদরাসার শিক্ষার্থী ও সমবেত মুসল্লীদের এবং প্রতি শুক্রবার জুমআর নামাযের পূর্বে সিলেট নগরীর সোবহানীঘাটে তাঁরই প্রতিষ্ঠিত হাজী নওয়াব আলী জামে মসজিদে সোবহানীঘাট কামিল মাদরাসার শিক্ষার্থী ও সমবেত মুসল্লীদের তিনি নিয়মিত কিরাত প্রশিক্ষণ দিতেন।
কিরাতের শিক্ষার্থীদের জন্য প্রয়োজন ইলমে তাজবীদের উপর সহায়ক গ্রন্থ। মক্কা শরীফ থেকে প্রত্যাবর্তনের পর আল্লামা ফুলতলী ছাহেব কিবলাহ কিরাত শিক্ষা দেয়া আরম্ভ করেন। তাজবীদের নিয়মাবলী শিক্ষার্থীদেরকে বলে দিতেন। কিন্তু এর দ্বারা সকল শিক্ষার্থীর পক্ষে সকল নিয়মাবলী আয়ত্ত্ব করা সম্ভব হতনা। তাই আল্লামা ছাহেব কিবলাহ উর্দু ভাষায় রচনা করলেন ‘আল কাউলুছ ছাদীদ’ নামে অত্যন্ত সুরচিত ও সহজবোধ্য তাজবীদের কিতাব, যা বর্তমানে বাংলা এবং ইংরেজি ভাষায় অনুদিত হয়ে হাজার হাজার শিক্ষার্থীকে আল কুরআনের সহীহ তিলাওয়াত শিক্ষা অর্জনে সহায়ত করে আসছে।
ফুলতলীতে অবস্থান করে যারা কিরাত প্রশিক্ষণ নিয়েছেন তারা দেখেছেন কুরআনের এই খিদমতে আল্লামা ছাহেব কিবলাহর আন্তরিকতা এবং প্রচেষ্টা। সময় হওয়ার আগেই ক্লাসে উপস্থিত হওয়া, তুলনামুলক দুর্বল ছাত্রদের প্রতি বিশেষ মনোযোগ দেওয়া ইত্যাদি সকল ক্ষেত্রে তিনি ছিলেন একজন আদর্শ শিক্ষক, একজন আদর্শ অভিভাবক।
আল কুরআনের খিদমতের আরেকটি দিক হচ্ছে কুরআনের হুকুম-আহকাম, বিধানাবলী মানুষকে শিক্ষা দেওয়া, শিক্ষা অর্জনে অনুপ্রাণিত করা। আল কুরআনের এই খিদমতেও আল্লামা ফুলতলী ছাহেব কিবলাহ’র রয়েছে অনন্য অবদান। তিনি নিজে একজন সুবক্তা হিসেবে দেশ-বিদেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে বিভিন্ন মাহফিলে আল কুরআনের হুকুম আহকাম, ইসলামের সঠিক আকীদা-বিশ্বাসকে জনসমাজে তুলে ধরেছেন। মানুষকে দেখিয়েছেন সঠিক পথের দিশা। বার্ধক্যে উপনীত হয়েও দীন ইসলামের প্রচার প্রসার ও ইকামতে দীনের সুকঠিন দায়িত্ব পালনে তিনি কখনো বিচলিত হন নি। আল্লামা ফুলতলী ছাহেব কিবলাহর খিদমত কেবল ইলমে কিরাতে সীমাবদ্ধ নয়; বরং তিনি এর পাশাপাশি ইলমে তাফসীর, ইলমে হাদীস, ইলমে ফিকহ, ইলমে তাসাওউফসহ সকল বিষয়ে পা-িত্য অর্জন করে তাঁর অমীয় সুধা বিলিয়ে দিয়েছেন। তিনি রচনা করেছেন আল কুরআনের তাফসীর বিষয়ে সমৃদ্ধ দালীলিক গ্রন্থ ‘আত তানভীর আলাত তাফসীর’, আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাআতের আকীদা নির্ভর বারো চাঁদের খুতবা ‘আল খুতবাতুল ইয়াকুবিয়া’সহ অনেক গ্রন্থ। আল কুরআন, আল হাদীস ও ইসলামী শিক্ষা ছড়িয়ে দিতে দেশ-বিদেশে প্রতিষ্ঠা করেছেন অসংখ্য ইসলামী প্রতিষ্ঠান। বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে কুরআন, হাদীস ও ফিকহের দারস প্রদান করেছেন দীর্ঘকাল। প্রাতিষ্ঠানিক গ-ির বাইরে থেকেও বাদেদেওরাইল ফুলতলী আলিয়া মাদরাসায় ইন্তিকালের পূর্ব পর্যন্ত ইলমে হাদীসের দারস দিয়ে গেছেন। ইলমে তরীকত, শিক্ষা-দীক্ষা, সমাজসেবাসহ সকল ক্ষেত্রে রেখে গেছেন অসামান্য অবদান।
আল্লামা ফুলতলী ছাহেব কিবলাহ আজ আমাদের মাঝে নেই। কিন্তু রেখে গেছেন তাঁর সুযোগ্য উত্তরসূরি। গঠন করে গেছেন অসংখ্য আলিমে দীন। রেখে গেছেন তাঁর সকল খিদমতের ধারাবাহিকতা। ফুলতলী ছাহেব কিবলাহর দীনী সকল খিদমতের ধারাবাহিকতা কিয়ামত পর্যন্ত টিকে থাকুক, তাঁর সকল খিদমত কবূল হোক আল্লাহর দরবারে, এই কামনা আমাদের। আল্লাহ আমাদেরকেও তাঁর রেখে যাওয়া সকল খিদমতের ধারাবাহিকতা রক্ষায় কাজ করে যাওয়ার তাওফীক দান করুন।

[লেখক : ইমাম ও খতীব, শাহজালাল মসজিদ এন্ড ইসলামিক সেন্টার
ম্যানচেস্টার, ইউকে]