[মুফতী মাওলানা গিয়াস উদ্দিন চৌধুরী ফুলতলী’র ‘তাকলীদ-এর সুদৃঢ় রজ্জু’ থেকে]
গায়র মুকল্লিদগণ হাফিয ইবনে তাইমিয়ার অনুসরণ করেন বলে দাবি করেন অথচ ইবনে তাইমিয়া মৃতের তালকীন সম্পর্কে বলেন-
وروى في تلقين الميت بعد الدفن حديث فيه نظر، لكن عمل به رجال من أهل الشام الأولين، مع روايتهم له، فلذلك استحبه أكثر أصحابنا وغيرهم. (إقتضاء الصراط المستقيم)
অর্থাৎ মৃতের দাফনের পর তালকীন সম্পর্কে যে হাদীস বর্ণিত তার সনদ দুর্বল। কিন্তু পূর্বসুরী শামের আলিমগণ এর উপর আমল করেছেন। এ কারণে আমাদের অধিকাংশ লোকদের নিকট ও অন্যান্যদের নিকট তা মুস্তাহাব। (ইকতিদাউস সিরাতাল মুস্তাকীম)
ইবনে তাইমিয়ার উক্ত মন্তব্য থেকে প্রমাণিত হয় যে, হাদীসের সনদে দুর্বলতা থাকলেও অর্থাৎ হাদীস যঈফ হওয়া সত্ত্বেও তার উপর আমল করা জায়িয ও মুস্তাহাব।
হাফিয ইবনুল কাইয়্যিম আল জাওযীওالروح কিতাবে তালকীনকে মুস্তাহাব বলেছেন।
উল্লেখ্য, আল্লাহর রাসূলের হাদীস নয় এমন কোন উক্তিকে তাঁর উক্তি বলা প্রসঙ্গে যেমন ভয়ংকর পরিণতির কথা হাদীসে উল্লেখ রয়েছে তেমনি কোন হাদীসকে হাদীস না বলাও হাদীস অস্বীকার করার পর্যায়ে পড়ে যায়। বর্তমান সময়ে দেখা যায়, কেউ কেউ কোন কোন হাদীস উল্লেখের ক্ষেত্রে বিভিন্ন কৌশল অবলম্বন করে তা পরিত্যাগ করার সুযোগ অন্বেষন করেন। যেমন কোন হাদীস সম্পর্কে হাদীস বিশেষজ্ঞদের لا يصح (সহীহ নয়), لا يثبت (ছাবিত নেই) ইত্যাদি মন্তব্যকে তারা হাদীস প্রত্যাখ্যানের মাধ্যম হিসেবে গ্রহণ করেন। কিন্তু তাদের এ কৌশল তাদের মুর্খতার পরিচয় প্রদান করে। কারণ উসুলে হাদীসের পরিভাষায় এসব উক্তি হাদীস অগ্রহণযোগ্য হওয়ার দলীল নয়। আল্লামা আব্দুল হাই লখনবী (র.) তাঁর লিখিত কিতাবে এ প্রসঙ্গে বিশ্ববরেণ্য হাদীস বিশেষজ্ঞদের উক্তি উল্লেখ করেছেন। তিনি লিখেছেনÑ কোন কোন মুহাদ্দিসীনে কিরাম কোন হাদীস সম্পর্কেلا يصح (অসহীহ নয়) অথবা لايثبت (সাবিত নেই) মন্তব্য করেন। তা দেখে অনেক অজ্ঞ লোক এটাকে موضوع (মউযু) বা ضعيف (দুর্বল) বলে ধারণা করেন। এটি তাদের হাদীসের পরিভাষা সম্পর্কে অজ্ঞতার উপর ভিত্তিশীল। মোল্লা আলী কারী (র.)تذكرة الموضوعات কিতাবে লেখেন عدم ثبوت (সাবিত নেই) কথা দ্বারা হাদীস موضوع (মউযু) হওয়াকে আবশ্যক করে না।
হাফিয ইবনে হাজার (র.) الاذكار গ্রন্থের হাদীসের তাখরীজ সম্পর্কিত তদীয় نتائج الافكار কিতাবে লেখেন- ওযুতে বিসমিল্লাহ পড়া প্রসঙ্গে ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বল (র.) থেকে বর্ণিত যে, তিনি বলেছেন, আমি ওযূতে বিসমিল্লাহ পড়া সম্পর্কিত কোন হাদীস জানি না। আমি বলি, কারো না জানা বাস্তবে তা না থাকা সাবিত করে না। যদি তা মেনে নেওয়াও হয় তবুও সাবিত না থাকা যঈফ হওয়াকে সাবিত করে না। কারণ হতে পারেثابت (প্রমাণিত) দ্বারাصحيح (সহীহ) বুঝানো হয়েছে, তাহলে তা حسن (হাসান) হতে পারে। যদি তাও মেনে নেয়া যায়; তাহলেও প্রত্যেক فرد এর নফী দ্বারা পুরো বিষয়টি نفي (না বাচক) হয়ে যায় না।
নূর উদ্দীন সামহুদী الشرفين فضل فى العقدين جواهر এর মধ্যে বলেন: আশুরার দিনে পরিবার-পরিজনের জন্য বেশি বেশি খরচ করার হাদীস সম্পর্কে ইমাম আহমদ (র.)-এর উক্তি لا يصح (সহীহ নয়) দ্বারা তা বাতিল হয়ে যায় না। বরং এটি غير صحيح (সহীহ নয় এমন) হতে পারে যা দলীল হিসেবে গ্রহণের যোগ্য, যখন এটি ‘হাসান’ হবে। এর স্তর সহীহ ও যঈফ হাদীসের মধ্যখানে।
যরকশী نكت ابن الصلاح গ্রন্থে বলেন, আমাদের কথা موضوع (মউযু) ও لا يصح (সহীহ নয়) এর মধ্যে বিরাট পার্থক্য রয়েছে। কারণ প্রথমটি মিথ্যা হওয়া সাবিত করে অপরদিকে দ্বিতীয়টি সাবিত না থাকার সংবাদ দেয়। আর সাবিত না থাকা বাস্তবে না থাকা বুঝায় না। একথা এমন সকল হাদীসের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হবে যেগুলো সম্পর্কে ইবনুল জাওযী لا يصح (সহীহ নয়) বলেছেন।
মোল্লা আলী কারী বলেছেন সাখাবীর উক্তি لا يصح (সহীহ নয়) যঈফ ও হাসানকে নফী করে না।
যুরকানী বলেন- আল্লামা কাসতালানী (র.) ইবনে রজব থেকে বর্ণনা করেন যে, ইবনে হিব্বান একে সহীহ বলেছেন। এতে ইবনে দেহইয়ার সেই বক্তব্য প্রত্যাখ্যান করা হয়েছে যাতে তিনি বলেছিলেন- ‘শাবানের মধ্যরাতের ফযীলত সম্পর্কে কোন সহীহ হাদীস নেই।’ যদিও তিনি সহীহ দ্বারা পারিভাষিক সহীহ বুঝিয়েছেন। কারণ মু‘আয (রা.)-এর হাদীস সহীহ নয় বরং হাসান। (আর রাফউ ওয়াত তাকমীল ফিল জারহি ওয়াত তা‘দীল, পৃষ্ঠা ১৯১-১৯৭)
মাযহাব ও তাকলীদ লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান
মাযহাব ও তাকলীদ লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান
শুক্রবার, ২৭ মার্চ, ২০১৫
শুক্রবার, ১৩ মার্চ, ২০১৫
সাহাবায়ে কিরামের তাকলীদ
আল্লামা মুফতী গিয়াস উদ্দিন চৌধুরী
সাহাবায়ে কিরামের যুগে অত্যন্ত সুশৃঙ্খলভাবে অভিজ্ঞ, ফকীহ ও মুজতাহিদ সাহাবীগণের তাকলীদ প্রচলিত ছিল যা মওকুফ হাদীস দ্বারা প্রমাণিত। তন্মধ্যে কয়েকটি হাদীস নিম্নে উল্লেখ করা হল।
০১। হযরত উমর (রা.)-এর নির্দেশ:
عَن عكرمةَ عن بن عباس قال خطب عُمَرُ بْنُ الْخَطَّابِ رَضِىَ اللهُ عَنْهُ خَطَبَ النَّاسَ بِالْجَابِيَةِ فَقَالَ : مَنْ أَرَادَ أَنْ يَسْأَلَ عَنِ الْقُرْآنِ فَلْيَأْتِ أُبَىَّ بْنَ كَعْبٍ وَمَنْ أَرَادَ أَنْ يَسْأَلَ عَنِ الْفَرَائِضِ فَلْيَأَتِ زَيْدَ بْنَ ثَابِتٍ وَمَنْ أَرَادَ أَنْ يَسْأَلَ عَنِ الْفِقْهِ فَلْيَأْتِ مُعَاذَ بْنَ جَبَلٍ وَمَنْ أَرَادَ أَنْ يَسْأَلَ عَنِ الْمَالِ فَلْيَأْتِنِى فَإِنَّ اللهَ تَعَالٰى جَعَلَنِى لَهُ والِيًا وَقَاسِمًا.
অর্থাৎ হযরত ইকরামাহ ইবনে আব্বাস (রা.) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, জাবিয়া নামক স্থানে হযরত উমর ইবনুল খাত্তাব (রা.) এক ভাষণ দিলেন। ভাষণে তিনি বলেন, হে লোক সকল! তোমাদের যে কুরআন (ইলমে কিরাত) সম্পর্কে জানতে চায়, সে যেন হযরত উবাই বিন কা’ব (রা.)-এর কাছে যায়। ফরাইয সম্পর্কে জানতে চাইলে যেন হযরত যায়দ বিন সাবিত (রা.)-এর কাছে যায়। ফিক্হ সম্পর্কে জানতে চাইলে মুআয বিন জাবাল (রা.)-এর কাছে যায়। আর অর্থ সম্পর্কিত কিছু জানতে চাইলে আমার কাছে আসবে। কারণ আল্লাহ আমাকে সম্পদের ওয়ালী ও বন্টনকারী করেছেন।
উক্ত হাদীস থেকে বুঝা যায়, যে যে বিষয়ে পারদর্শী সে বিষয়ে তার তাকলীদ করা যাবে।
২। ঋণ পরিশোধ সম্পর্কে হযরত ইবনে উমর (রা.)-এর হাদীস:
عَنْ سَالِمِ بْنِ عَبْدِ اللهِ عَنْ عَبْدِ اللهِ بْنِ عُمَرَ أَنَّهُ سُئِلَ عَنْ الرَّجُلِ يَكُونُ لَهُ الدَّيْنُ عَلَى الرَّجُلِ إِلَى أَجَلٍ فَيَضَعُ عَنْهُ صَاحِبُ الْحَقِّ وَيُعَجِّلُهُ الْآخَرُ فَكَرِهَ ذَلِكَ عَبْدُ اللهِ بْنُ عُمَرَ وَنَهَى عَنْه.
অর্থাৎ হযরত সালিম বিন আব্দুল্লাহ (র.) হতে বর্ণিত, তিনি হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে উমর (রা.) হতে বর্ণনা করেন- তাঁকে প্রশ্ন করা হয়েছিল এমন এক ব্যক্তি সম্পর্কে যে অন্য এক জনের কাছে মেয়াদী ঋণে পাওনাদার ছিল। এখন সে মেয়াদের পূর্বে পরিশোধের শর্তে কিছু ছাড় দিতে রাজী। হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে উমর (রা.) তা অপছন্দ করলেন এবং এরূপ করতে নিষেধ করলেন। (মুসনাদে ইমাম মালিক)
উক্ত হাদীসে হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে উমর (রা.) নিজের কথার সমর্থনে কোন আয়াত বা মারফু হাদীস উল্লেখ করেননি। সুতরাং বুঝা যায় এটা তার নিজস্ব ইজতিহাদ। আর প্রশ্নকর্তা তাঁর ইজতিহাদী ফতওয়াকে দলীল-প্রমাণ তলব ছাড়াই মেনে নেন।
৩। হযরত সা’দ বিন আবূ ওয়াক্কাস (রা.) মসজিদে নামায আদায় করলে রুকু, সিজদা ও সালাত সংক্ষিপ্ত অথচ পরিপূর্ণরূপে করতেন। কিন্তু বাড়িতে নামায আদায় করলে তা দীর্ঘ করে আদায় করতেন। তাঁর ছেলে হযরত মুসআব (রা.) এ ব্যাপারে তাঁকে জিজ্ঞেস করলে তিনি জবাব দেন-
يَا بُنَي ، إِنَّا أَئِمَّةٌ يُقْتَدَى بِنَا. (إتحاف الخيرة المهرة ، مُصنف ابن أبي شيبة)
অর্থাৎ হে আমার বৎস! আমরা হলাম ইমাম, আমাদের অনুসরণ করা হয়।
এ হাদীস থেকে বুঝা যায় হযরত সা’দ (রা.)-এর নামায দীর্ঘ হলে তা দেখে লোকেরা মনে করবে এরূপ করা জরুরী এবং তারা তাঁকে দলীল জিজ্ঞেস না করেই আমল শুরু করে দিবে, যা তাদের জন্য কঠিন হয়ে যাবে।
৪। ইহরাম অবস্থায় হযরত তালহা বিন উবায়দুল্লাহ (রা.)-এর গায়ে রঙ্গীন কাপড় দেখে হযরত উমর (রা.) তাঁকে এরূপ কাপড় পরিধানের কারণ জিজ্ঞেস করলেন। হযরত তালহা (রা.) জবাব দিলেন, হে আমীরুল মু’মিনীন, এ রং-এ ঘ্রাণ নেই। আর ঘ্রাণ না থাকলে রঙ্গীন কাপড় পরিধান করতে কোন বাঁধা নেই। জবাবে হযরত উমর (রা.) বলেন-
إِنَّكُمْ أَيُّهَا الرَّهْطُ أَئِمَّةٌ يَقْتَدِى بِكُمُ النَّاسُ فَلَوْ أَنَّ رَجُلاً جَاهِلاً رَأَى هَذَا الثَّوْبَ لَقَالَ : إِنَّ طَلْحَةَ بْنَ عُبَيْدِ اللهِ قَدْ كَانَ يَلْبَسُ الثِّيَابَ الْمُصْبَغَةَ فِى الإِحْرَامِ فَلاَ تَلْبَسُوا أَيُّهَا الرَّهْطُ شَيْئًا مِنْ هَذِهِ الثِّيَابِ الْمُصْبَغَةِ. (موطأ الإمام مالك)
অর্থাৎ আপনারা হলেন ইমাম। লোকজন আপনাদের অনুসরণ করে। যদি কোন অজ্ঞ লোক এ পোশাক দেখে তা হলে বলবে, তালহা বিন উবায়দুল্লাহ (রা.) ইহরাম অবস্থায় রঙ্গীন কাপড় পরিধান করতেন। সুতরাং আপনারা এরূপ রঙ্গীন কাপড় পরিধান করবেন না।
০৫। হযরত আম্মার বিন ইয়াসির ও আব্দুল্লাহ বিন মাসউদ (রা.)-কে হযরত উমর (রা.) কুফায় প্রেরণ করেন। তাদের সাথে কুফাবাসীদের উদ্দেশ্যে একটি চিঠি দেন। চিঠির ভাষ্য ছিল নিম্নরূপ:
إني قد بعثت إليكم بعمار بن ياسر أميرا وابن مسعود معلما ووزيرا وهما من النجباء من أصحاب محمد صلى الله عليه وسلم فاقتدوا بهما واسمعوا من قولهما. (تاريخ مدينة دمشق وذكر فضلها)
-আমি তোমাদের কাছে আম্মার বিন ইয়াসির (রা.)-কে আমির এবং আব্দুল্লাহ বিন মাসউদ (রা.)-কে শিক্ষক ও ওযীর হিসেবে পাঠালাম। তাঁরা দু’জনই হলেন আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর বিশিষ্ট দুই বদরী সাহাবী। সুতরাং তাঁদের ইকতিদা করবে ও যাবতীয় নির্দেশ মেনে চলবে।
উপরোক্ত বর্ণনাসমূহ থেকে প্রমাণিত হয় যে, সাহাবায়ে কিরামের যুগে তাকলীদ প্রচলিত ও স্বীকৃত ছিল। এমনকি স্বয়ং দ্বিতীয় খলীফা হযরত ওমর (রা.) বিভিন্ন বিষয়ে বিভিন্ন সাহাবীকে অনুসরণের ঘোষণা পর্যন্ত দিয়েছেন। যদি তাকলীদ বৈধ না হতো তাহলে উমর (রা.) এরূপ ঘোষণা দিতেন না। এমনিভাবে সাহাবায়ে কিরাম (রা.)-এর যুগ থেকে তাবিঈ, তাবে তাবিঈনের যুগ ধরে সর্বযুগে তাকলীদ চলে আসছে। সুতরাং তাকলীদ শিরক হওয়ার তো প্রশ্নই আসে না বরং তা জরুরী, বিশেষ করে গায়র মুজতাহিদ আলিমের জন্য তা অপরিহার্য।
কিন্তু অত্যন্ত দুঃখজনক হলেও সত্য যে, কিছু লোক নিজেদেরকে সর্ব বিষয়ে মহাজ্ঞানী মনে করে বলতে থাকে- শরীআতের মূলনীতি হল কুরআন ও হাদীস। এর বাইরে কোন কিছু মানা যাবে না। তারা কোন ইমামের অনুসরণ বা তাকলীদকে র্শিক বলতে শুরু করলো। তাদের কেউ কেউ আবার সহীহ হাদীস অনুসরণের কথা বলে কেবল বুখারী শরীফে সংকলিত হাদীসের উপর আমল করতেই বেশি আগ্রহী। অথচ বাস্তবে দেখা যায় বুখারী শরীফের অনেক হাদীসের উপরও তাঁদের আমল নেই। ইমাম বুখারী (র.)-এর মতের সাথে তাদের মতামতের কোন মিল নেই। এমনকি পরবর্তী যুগের গায়র মুকল্লিদগণ তাদের পূর্বসূরীদের অনেকের মতামতকে অশালীন ভাষায় প্রত্যাখ্যান করেছেন। এরা নিজেদেরকে আহলে হাদীস বলে পরিচয় দেন, অথচ হাদীসের কিতাব বলতে তারা বুঝেন কেবল বুখারী ও কোন কোন ক্ষেত্রে মুসলিম শরীফ। এছাড়া হাদীসের কিতাবকে তারা আমলে আনেন না। তাদের এ আচরণ স্ববিরোধী ও ভ্রান্ত তাতে কোন সন্দেহ নেই।
[সূত্র : তাকলীদ-এর সুদৃঢ় রজ্জু]
শনিবার, ৭ মার্চ, ২০১৫
কুরআন ও সুন্নাহর আলোকে তাকলীদের প্রয়োজনীয়তা
মুফতী মাওলানা মো: গিয়াস উদ্দিন চৌধুরী ফুলতলী
কুরআন, সুন্নাহ এবং কুরআন-সুন্নাহর আলোকে সংঘটিত ইজমা ও কিয়াস-এ চারটি মূলনীতি হচ্ছে দীন ও শরীআতের যাবতীয় বিধি বিধানের মাপকাঠি। কিন্তু কুরআন সুন্নাহতে বর্ণিত আহকামসমূহের প্রত্যেকটি সমান নয়। কিছু কিছু আহকাম হচ্ছে স্পষ্ট ও বিরোধমুক্ত। যেমন নামায ফরয হওয়া, রোযা ফরয হওয়া, হজ্জ ফরয হওয়া, যিনা নিষিদ্ধ হওয়া, মদ খাওয়া ও চুরি করা নিষিদ্ধ হওয়া ইত্যাদি। এগুলোর উপর আমলের জন্য কোন প্রকার চিন্তা গবেষণার প্রয়োজন নেই।
পক্ষান্তরে কিছু কিছু আহকাম হচ্ছে এমন যে, এগুলো সম্পর্কে বর্ণিত আয়াত বা হাদীস অস্পষ্ট, সংক্ষিপ্ত বা আপাত:দৃষ্টিতে বিরোধপূর্ণ। যেমন- আল্লাহ তা’আলার বাণী: وَالْمُطَلَّقَاتُ يَتَرَبَّصْنَ بِأَنْفُسِهِنَّ ثَلَاثَةَ قُرُوءٍ আলোচ্য আয়াতে قُرُوءٍ শব্দটি দুইটি অর্থে মুশতারাক। একটি হলো حيض (ঋতুস্রাব), অপরটি হলো طهر (পবিত্রতা)। সুতরাং এখানে শব্দটি কোন অর্থে গৃহীত হবে সে বিষয়ে চিন্তা-গবেষণার প্রয়োজন আছে।
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর হাদীস:
مَنْ لم يترك المخابرة فليأذَن بِحَرب من الله ورسوله. (جامع الأصول في أحاديث الرسول)
অর্থাৎ যে মুখাবারা বা বর্গা ব্যবস্থা পরিহার করে না সে যেন আল্লাহ ও রাসূলের সাথে যুদ্ধে নামার ঝুঁকি নেয়।
এ হাদীস থেকে আমভাবে বর্গা প্রথা নিষিদ্ধ বুঝা যাচ্ছে। কিন্তু সকল বর্গাই নিষিদ্ধ নাকি এর বিশেষ কোন প্রকার নিষিদ্ধ তা এখানে সুস্পষ্ট নয়।
অন্য হাদীসে আছে- مَنْ كَانَ لَهُ إِمَامٌ فَقِرَاءَةُ الإِمَامِ لَهُ قِرَاءَةٌ . (إتحاف الخيرة المهرة) অর্থাৎ যে ইমামের পেছনে নামায পড়বে, ইমামের কিরাত তার জন্য যথেষ্ট হবে। অপরদিকে অন্য হাদীসে এসেছে-
لاَ صَلاَةَ لِمَنْ لَمْ يَقْرَأْ بِفَاتِحَةِ الْكِتَابِ. (إتحاف الخيرة المهرة)
অর্থাৎ যে সূরা ফাতিহা পড়েনি তার নামায শুদ্ধ হয়নি।
আলোচ্য হাদীসদ্বয় আপাতদৃষ্টিতে বিরোধপূর্ণ হওয়ায় কোন হাদীসের উপর আমল করা যাবে তা স্পষ্ট নয় এবং স্বাভাবিক ইলম দ্বারা তা বুঝাও সম্ভব নয়।
এ ধরণের জটিল সমস্যার ক্ষেত্রে আমলের জন্য দুটি পথ। প্রথমত: নিজেদের জ্ঞান বুদ্ধি ও প্রজ্ঞার উপর নির্ভর করে ফয়সালা করা। দ্বিতীয়ত: এ ব্যাপারে পূর্বসূরীগণের প্রজ্ঞাপূর্ণ সিদ্ধান্তের আলোকে আমল করা। এ ক্ষেত্রে দ্বিতীয় পথই সাধারণ মানুষ ও অমুজতাহিদ আলিমের জন্য অপরিহার্য। তা না হলে ভুল সিদ্ধান্তে উপনীত হওয়ার সমূহ সম্ভাবনা থাকে। আর এরূপ মাসআলায় নির্দ্বিধায় কোন মুজতাহিদের অনুসরণ করার নামই হচ্ছে তাকলীদ।
জটিল মাসআলায় সাধারণ লোকদের তাকলীদ ছাড়া কোন পথই নেই। তাদেরকে পূর্বসূরী প্রজ্ঞাশীল কোন মুজতাহিদকে অনুসরণ করতেই হবে। পবিত্র কুরআন ও হাদীসে এরূপ তাকলীদের সরাসরি নির্দেশ দেয়া হয়েছে।
কুরআন মজীদে তাকলীদের দলীল
১। আল্লাহ পাক ইরশাদ করেন-
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا أَطِيعُوا اللهَ وَأَطِيعُوا الرَّسُولَ وَأُولِي الْأَمْرِ مِنْكُمْ .
অর্থাৎ হে ঈমানদারগণ! তোমরা আল্লাহর আনুগত্য কর, রাসূলের আনুগত্য কর এবং উলুল আমর এর আনুগত্য কর। (সূরা নিসা- ৫৯)
উক্ত আয়াতেأُولِي الْأَمْرِ বলতে কারা- এর ব্যাখ্যায় মুফাসসিরীনে কিরাম প্রায় সকলেই বলেছেন, এরা হলেন কুরআন সুন্নাহ’র ইলমের অধিকারী ফকীহ ও মুজতাহিদগণ।
২। পবিত্র কুরআনের অন্য আয়াতে আছে-
وَإِذَا جَاءَهُمْ أَمْرٌ مِنَ الْأَمْنِ أَوِ الْخَوْفِ أَذَاعُوا بِهِ وَلَوْ رَدُّوهُ إِلَى الرَّسُولِ وَإِلَى أُولِي الْأَمْرِ مِنْهُمْ لَعَلِمَهُ الَّذِينَ يَسْتَنْبِطُونَهُ مِنْهُمْ .
অর্থাৎ যখন তাদের কাছে শান্তি অথবা ভীতি সংক্রান্ত কোন সংবাদ আসে, তখন তারা তা প্রচারে লেগে যায়। অথচ যদি (তারা তা না করে) বিষয়টি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ও উলুল আমর এর কাছে ছেড়ে দিত, তাহলে ইস্তিম্বাতে পারদর্শী তথা সূক্ষ্ম জ্ঞানের অধিকারীগণ এর রহস্য উদঘাটন করতে পারতেন। (সূরা নিসা- ৮৩)
উক্ত আয়াত যুদ্ধ সম্পর্কে নাযিল হলেও একথা সর্বজনস্বীকৃত যে, পবিত্র কুরআনের কোন আয়াতের শানে নুযুল খাস হলেও এর উপর আমল আম। এ আয়াত দ্বারা প্রতীয়মান হয় যে, কোন জটিল বিষয়ে হুট করে সিদ্ধান্ত নেয়ার পরিবর্তে বিজ্ঞ লোকদের প্রজ্ঞাশীল সিদ্ধান্তের অনুসরণ ও তাকলীদ করা আবশ্যক।
৩। অন্য আয়াতে আল্লাহ পাক ইরশাদ করেন-
فَلَوْلَا نَفَرَ مِنْ كُلِّ فِرْقَةٍ مِنْهُمْ طَائِفَةٌ لِيَتَفَقَّهُوا فِي الدِّينِ وَلِيُنْذِرُوا قَوْمَهُمْ إِذَا رَجَعُوا إِلَيْهِمْ لَعَلَّهُمْ يَحْذَرُونَ
Ñপ্রত্যেক দল থেকে এক একটি ছোট দল ধর্মের গভীর জ্ঞান অর্জনের জন্য কেন বেরিয়ে পড়ে না, যাতে তারা যখন তাদের কওমের কাছে ফিরে আসবে তখন তাদেরকে ভীতি প্রদর্শন করবে, যেন তারা সতর্ক হয়। (সূরা তাওবাহ- ১২২)
উক্ত আয়াতে ধর্মের গভীর জ্ঞান অর্জনের জন্য একদল লোককে নির্দেশ দেয়া হয়েছে। আর কওমের বাকী লোক যারা এ জ্ঞান অর্জনের সুযোগ লাভ করতে পারেনি তাদেরকে ঐ ফকীহদের আনুগত্য বা তাকলীদের নির্দেশ দেয়া হয়েছে।
৪। আল্লাহ তাআলার বাণী- فَاسْأَلُوا أَهْلَ الذِّكْرِ إِنْ كُنْتُمْ لَا تَعْلَمُونَ অর্থাৎ তোমরা যদি না জান তাহলে আহলে ইলমদের কাছ থেকে জেনে নাও। (সূরা নহল- ৪৩, আম্বিয়া- ০৭)
আলোচ্য আয়াতে আল্লাহ সকলকে কুরআন হাদীস থেকে সরাসরি ফতওয়া বের করার নির্দেশ না দিয়ে বরং কুরআন হাদীসের ইলমে পারদর্শী লোকদের কাছ থেকে অজ্ঞ লোকদের জেনে নেয়ার নির্দেশ দিয়েছেন। তাকলীদের মূল কথাও হলো তাই।
হাদীস শরীফ থেকে তাকলীদের দলীল
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর অসংখ্য হাদীস থেকে অপেক্ষাকৃত বিজ্ঞ আলিমের কাছে ফতওয়া তলব ও তদনুযায়ী আমল করার নির্দেশ ও প্রমাণ পাওয়া যায়। উদাহরণ স্বরূপ এখানে কয়েকটি হাদীস উল্লেখ করা হল।
০১। হাদীস শরীফে আছে-
عَنْ حُذَيْفَةَ قَالَ كُنَّا عِنْدَ النَّبِيِّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ جُلُوسًا فَقَالَ إِنِّي لَا أَدْرِي مَا قَدْرُ بَقَائِي فِيكُمْ فَاقْتَدُوا بِالَّذَيْنِ مِنْ بَعْدِي وَأَشَارَ إِلَى أَبِي بَكْرٍ وَعُمَرَ.
-হযরত হুযায়ফা (রা.) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেন- জানি না আমি আর কতদিন তোমাদের মধ্যে থাকব। সুতরাং তোমরা আমার পরবর্তীদের অনুসরণ করবে। একথা বলে তিনি আবূ বকর ও উমর (রা.)-এর প্রতি ইঙ্গিত করেছেন। (তিরমিযী, ইবনে মাজাহ, মুসনাদে ইমাম আহমদ)
উক্ত হাদীসে ‘ইকতিদা’ শব্দের ব্যবহার হয়েছে। যার অর্থ শরীআতের বিষয়সমূহে কেউ কারো অনুসরণ করা।
০২। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেন-
مَنْ أُفْتِىَ بِغَيْرِ عِلْمٍ كَانَ إِثْمُهُ عَلَى مَنْ أَفْتَاهُ.
অর্থাৎ যে না জেনে ফতওয়া প্রদান করবে, এর পাপ ফতওয়াদাতার উপরই পতিত হবে।
লক্ষ্যণীয় যে, এখানে ফতওয়ার দায়-দায়িত্ব ফতওয়াদাতার উপর চাপানো হয়েছে। কিন্তু তার ফতওয়া অনুযায়ী যারা আমল করেছেন তাদেরকে দোষারোপ করা হয়নি। আবার অনুসরণকারীদেরকে যাচাই বাছাই করে ফতওয়া গ্রহণের নির্দেশও দেয়া হয়নি। এরূপ হলে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ফতওয়াদাতা ও আমলকারী উভয়কে সমানভাবে দোষারোপ করতেন। এতে বুঝা যায় একদল লোক কেবল তাকলীদ করবেন এবং তাদের তাকলীদ করা শুদ্ধ হবে।
০৩। কোন কোন সাহাবী নামাযের জামাতে দেরিতে এসে পেছনে দাঁড়ালে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাদেরকে প্রথমে এসে প্রথম কাতারে দাঁড়ানোর তাকীদ দিয়ে ইরশাদ করেন-
ائْتَمُّوا بِي وَلْيَأْتَمَّ بِكُمْ مَنْ بَعْدَكُمْ
অর্থাৎ তোমরা আমার অনুসরণ কর আর তোমাদের পরবর্তীরা তোমাদের অনুসরণ করবে।
কুরআন, সুন্নাহ এবং কুরআন-সুন্নাহর আলোকে সংঘটিত ইজমা ও কিয়াস-এ চারটি মূলনীতি হচ্ছে দীন ও শরীআতের যাবতীয় বিধি বিধানের মাপকাঠি। কিন্তু কুরআন সুন্নাহতে বর্ণিত আহকামসমূহের প্রত্যেকটি সমান নয়। কিছু কিছু আহকাম হচ্ছে স্পষ্ট ও বিরোধমুক্ত। যেমন নামায ফরয হওয়া, রোযা ফরয হওয়া, হজ্জ ফরয হওয়া, যিনা নিষিদ্ধ হওয়া, মদ খাওয়া ও চুরি করা নিষিদ্ধ হওয়া ইত্যাদি। এগুলোর উপর আমলের জন্য কোন প্রকার চিন্তা গবেষণার প্রয়োজন নেই।
পক্ষান্তরে কিছু কিছু আহকাম হচ্ছে এমন যে, এগুলো সম্পর্কে বর্ণিত আয়াত বা হাদীস অস্পষ্ট, সংক্ষিপ্ত বা আপাত:দৃষ্টিতে বিরোধপূর্ণ। যেমন- আল্লাহ তা’আলার বাণী: وَالْمُطَلَّقَاتُ يَتَرَبَّصْنَ بِأَنْفُسِهِنَّ ثَلَاثَةَ قُرُوءٍ আলোচ্য আয়াতে قُرُوءٍ শব্দটি দুইটি অর্থে মুশতারাক। একটি হলো حيض (ঋতুস্রাব), অপরটি হলো طهر (পবিত্রতা)। সুতরাং এখানে শব্দটি কোন অর্থে গৃহীত হবে সে বিষয়ে চিন্তা-গবেষণার প্রয়োজন আছে।
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর হাদীস:
مَنْ لم يترك المخابرة فليأذَن بِحَرب من الله ورسوله. (جامع الأصول في أحاديث الرسول)
অর্থাৎ যে মুখাবারা বা বর্গা ব্যবস্থা পরিহার করে না সে যেন আল্লাহ ও রাসূলের সাথে যুদ্ধে নামার ঝুঁকি নেয়।
এ হাদীস থেকে আমভাবে বর্গা প্রথা নিষিদ্ধ বুঝা যাচ্ছে। কিন্তু সকল বর্গাই নিষিদ্ধ নাকি এর বিশেষ কোন প্রকার নিষিদ্ধ তা এখানে সুস্পষ্ট নয়।
অন্য হাদীসে আছে- مَنْ كَانَ لَهُ إِمَامٌ فَقِرَاءَةُ الإِمَامِ لَهُ قِرَاءَةٌ . (إتحاف الخيرة المهرة) অর্থাৎ যে ইমামের পেছনে নামায পড়বে, ইমামের কিরাত তার জন্য যথেষ্ট হবে। অপরদিকে অন্য হাদীসে এসেছে-
لاَ صَلاَةَ لِمَنْ لَمْ يَقْرَأْ بِفَاتِحَةِ الْكِتَابِ. (إتحاف الخيرة المهرة)
অর্থাৎ যে সূরা ফাতিহা পড়েনি তার নামায শুদ্ধ হয়নি।
আলোচ্য হাদীসদ্বয় আপাতদৃষ্টিতে বিরোধপূর্ণ হওয়ায় কোন হাদীসের উপর আমল করা যাবে তা স্পষ্ট নয় এবং স্বাভাবিক ইলম দ্বারা তা বুঝাও সম্ভব নয়।
এ ধরণের জটিল সমস্যার ক্ষেত্রে আমলের জন্য দুটি পথ। প্রথমত: নিজেদের জ্ঞান বুদ্ধি ও প্রজ্ঞার উপর নির্ভর করে ফয়সালা করা। দ্বিতীয়ত: এ ব্যাপারে পূর্বসূরীগণের প্রজ্ঞাপূর্ণ সিদ্ধান্তের আলোকে আমল করা। এ ক্ষেত্রে দ্বিতীয় পথই সাধারণ মানুষ ও অমুজতাহিদ আলিমের জন্য অপরিহার্য। তা না হলে ভুল সিদ্ধান্তে উপনীত হওয়ার সমূহ সম্ভাবনা থাকে। আর এরূপ মাসআলায় নির্দ্বিধায় কোন মুজতাহিদের অনুসরণ করার নামই হচ্ছে তাকলীদ।
জটিল মাসআলায় সাধারণ লোকদের তাকলীদ ছাড়া কোন পথই নেই। তাদেরকে পূর্বসূরী প্রজ্ঞাশীল কোন মুজতাহিদকে অনুসরণ করতেই হবে। পবিত্র কুরআন ও হাদীসে এরূপ তাকলীদের সরাসরি নির্দেশ দেয়া হয়েছে।
কুরআন মজীদে তাকলীদের দলীল
১। আল্লাহ পাক ইরশাদ করেন-
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا أَطِيعُوا اللهَ وَأَطِيعُوا الرَّسُولَ وَأُولِي الْأَمْرِ مِنْكُمْ .
অর্থাৎ হে ঈমানদারগণ! তোমরা আল্লাহর আনুগত্য কর, রাসূলের আনুগত্য কর এবং উলুল আমর এর আনুগত্য কর। (সূরা নিসা- ৫৯)
উক্ত আয়াতেأُولِي الْأَمْرِ বলতে কারা- এর ব্যাখ্যায় মুফাসসিরীনে কিরাম প্রায় সকলেই বলেছেন, এরা হলেন কুরআন সুন্নাহ’র ইলমের অধিকারী ফকীহ ও মুজতাহিদগণ।
২। পবিত্র কুরআনের অন্য আয়াতে আছে-
وَإِذَا جَاءَهُمْ أَمْرٌ مِنَ الْأَمْنِ أَوِ الْخَوْفِ أَذَاعُوا بِهِ وَلَوْ رَدُّوهُ إِلَى الرَّسُولِ وَإِلَى أُولِي الْأَمْرِ مِنْهُمْ لَعَلِمَهُ الَّذِينَ يَسْتَنْبِطُونَهُ مِنْهُمْ .
অর্থাৎ যখন তাদের কাছে শান্তি অথবা ভীতি সংক্রান্ত কোন সংবাদ আসে, তখন তারা তা প্রচারে লেগে যায়। অথচ যদি (তারা তা না করে) বিষয়টি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ও উলুল আমর এর কাছে ছেড়ে দিত, তাহলে ইস্তিম্বাতে পারদর্শী তথা সূক্ষ্ম জ্ঞানের অধিকারীগণ এর রহস্য উদঘাটন করতে পারতেন। (সূরা নিসা- ৮৩)
উক্ত আয়াত যুদ্ধ সম্পর্কে নাযিল হলেও একথা সর্বজনস্বীকৃত যে, পবিত্র কুরআনের কোন আয়াতের শানে নুযুল খাস হলেও এর উপর আমল আম। এ আয়াত দ্বারা প্রতীয়মান হয় যে, কোন জটিল বিষয়ে হুট করে সিদ্ধান্ত নেয়ার পরিবর্তে বিজ্ঞ লোকদের প্রজ্ঞাশীল সিদ্ধান্তের অনুসরণ ও তাকলীদ করা আবশ্যক।
৩। অন্য আয়াতে আল্লাহ পাক ইরশাদ করেন-
فَلَوْلَا نَفَرَ مِنْ كُلِّ فِرْقَةٍ مِنْهُمْ طَائِفَةٌ لِيَتَفَقَّهُوا فِي الدِّينِ وَلِيُنْذِرُوا قَوْمَهُمْ إِذَا رَجَعُوا إِلَيْهِمْ لَعَلَّهُمْ يَحْذَرُونَ
Ñপ্রত্যেক দল থেকে এক একটি ছোট দল ধর্মের গভীর জ্ঞান অর্জনের জন্য কেন বেরিয়ে পড়ে না, যাতে তারা যখন তাদের কওমের কাছে ফিরে আসবে তখন তাদেরকে ভীতি প্রদর্শন করবে, যেন তারা সতর্ক হয়। (সূরা তাওবাহ- ১২২)
উক্ত আয়াতে ধর্মের গভীর জ্ঞান অর্জনের জন্য একদল লোককে নির্দেশ দেয়া হয়েছে। আর কওমের বাকী লোক যারা এ জ্ঞান অর্জনের সুযোগ লাভ করতে পারেনি তাদেরকে ঐ ফকীহদের আনুগত্য বা তাকলীদের নির্দেশ দেয়া হয়েছে।
৪। আল্লাহ তাআলার বাণী- فَاسْأَلُوا أَهْلَ الذِّكْرِ إِنْ كُنْتُمْ لَا تَعْلَمُونَ অর্থাৎ তোমরা যদি না জান তাহলে আহলে ইলমদের কাছ থেকে জেনে নাও। (সূরা নহল- ৪৩, আম্বিয়া- ০৭)
আলোচ্য আয়াতে আল্লাহ সকলকে কুরআন হাদীস থেকে সরাসরি ফতওয়া বের করার নির্দেশ না দিয়ে বরং কুরআন হাদীসের ইলমে পারদর্শী লোকদের কাছ থেকে অজ্ঞ লোকদের জেনে নেয়ার নির্দেশ দিয়েছেন। তাকলীদের মূল কথাও হলো তাই।
হাদীস শরীফ থেকে তাকলীদের দলীল
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর অসংখ্য হাদীস থেকে অপেক্ষাকৃত বিজ্ঞ আলিমের কাছে ফতওয়া তলব ও তদনুযায়ী আমল করার নির্দেশ ও প্রমাণ পাওয়া যায়। উদাহরণ স্বরূপ এখানে কয়েকটি হাদীস উল্লেখ করা হল।
০১। হাদীস শরীফে আছে-
عَنْ حُذَيْفَةَ قَالَ كُنَّا عِنْدَ النَّبِيِّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ جُلُوسًا فَقَالَ إِنِّي لَا أَدْرِي مَا قَدْرُ بَقَائِي فِيكُمْ فَاقْتَدُوا بِالَّذَيْنِ مِنْ بَعْدِي وَأَشَارَ إِلَى أَبِي بَكْرٍ وَعُمَرَ.
-হযরত হুযায়ফা (রা.) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেন- জানি না আমি আর কতদিন তোমাদের মধ্যে থাকব। সুতরাং তোমরা আমার পরবর্তীদের অনুসরণ করবে। একথা বলে তিনি আবূ বকর ও উমর (রা.)-এর প্রতি ইঙ্গিত করেছেন। (তিরমিযী, ইবনে মাজাহ, মুসনাদে ইমাম আহমদ)
উক্ত হাদীসে ‘ইকতিদা’ শব্দের ব্যবহার হয়েছে। যার অর্থ শরীআতের বিষয়সমূহে কেউ কারো অনুসরণ করা।
০২। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেন-
مَنْ أُفْتِىَ بِغَيْرِ عِلْمٍ كَانَ إِثْمُهُ عَلَى مَنْ أَفْتَاهُ.
অর্থাৎ যে না জেনে ফতওয়া প্রদান করবে, এর পাপ ফতওয়াদাতার উপরই পতিত হবে।
লক্ষ্যণীয় যে, এখানে ফতওয়ার দায়-দায়িত্ব ফতওয়াদাতার উপর চাপানো হয়েছে। কিন্তু তার ফতওয়া অনুযায়ী যারা আমল করেছেন তাদেরকে দোষারোপ করা হয়নি। আবার অনুসরণকারীদেরকে যাচাই বাছাই করে ফতওয়া গ্রহণের নির্দেশও দেয়া হয়নি। এরূপ হলে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ফতওয়াদাতা ও আমলকারী উভয়কে সমানভাবে দোষারোপ করতেন। এতে বুঝা যায় একদল লোক কেবল তাকলীদ করবেন এবং তাদের তাকলীদ করা শুদ্ধ হবে।
০৩। কোন কোন সাহাবী নামাযের জামাতে দেরিতে এসে পেছনে দাঁড়ালে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাদেরকে প্রথমে এসে প্রথম কাতারে দাঁড়ানোর তাকীদ দিয়ে ইরশাদ করেন-
ائْتَمُّوا بِي وَلْيَأْتَمَّ بِكُمْ مَنْ بَعْدَكُمْ
অর্থাৎ তোমরা আমার অনুসরণ কর আর তোমাদের পরবর্তীরা তোমাদের অনুসরণ করবে।
[সূত্র : মুফতী মাওলানা মো: গিয়াস উদ্দিন চৌধুরী ফুলতলী কৃত ‘তাকলীদের সুদৃঢ় রজ্জু’]
বুধবার, ৪ মার্চ, ২০১৫
তাকলীদ ও আহলে হাদীস
মাহমুদুল হাসান
তাকলীদ এর আভিধানিক অর্থ গলায় হার পরানো। শরী‘আতের পরিভাষায় তাকলীদ হলো নির্ভরযোগ্য আলিম এর মতামতকে সঠিক জেনে দলীল তলব না করে মানার নাম তাকলীদ।
দলীল-প্রমাণ না চেয়ে আলিমের রায় মেনে নেওয়াই হলো তাকলীদ। সালাফে সালেহীন তথা আহলে সুন্নাত ওয়াল জামা‘আতের উলামোয়ে কিরাম যুগ যুগ ধরে আইম্মায়ে আরবা‘আ (ইমাম আবূ হানিফা, ইমাম মালিক, ইমাম শাফেঈ, ইমাম আহমদ বিন হাম্বল) এর কোন কোন এক ইমামের তাকলীদ করে আসছেন। এমনকি নব্যপ্রসূত লা-মাযহাবীরা হাদীসের ক্ষেত্রে যে শায়খুল ইসলাম ইবনে তাইমিয়াকে অনুসরণ করে তিনিও তাকলীদে বিশ্বাস করতেন এবং মানতেন। তার ছাত্র ইবনু কাইয়িম আল জাওযিয়্যাহও মাযহাব মানতেন। ইবনু তাইমিয়ার মাযহাব সম্পর্কে আহলে হাদীসদের অন্যতম আলেম সিদ্দিক হাসান তাঁর “আল-জুন্নাহ” কিতাবের ৩৮ পৃষ্টায় বলেন- শায়খূল ইসলাম ইমাম ইবনু তাইমিয়া হাম্বলী মাযহাবের অনুসারী ছিলেন। তার ছাত্র ইবনু কাইয়িমও হাম্বলী মাযহাবের অনুসারী ছিলেন।
ইবনু তাইমিয়া এবং ইবনু কাইয়িম আল জাওযিয়্যাহ এর মাযহাব হাম্বলী হওয়ার ব্যাপারে কোন সন্দেহ নাই। তাঁর লিখিত “মাজমুআতুল ফাতাওয়া” এর প্রমাণ বহন করে।
প্রশ্ন হলো তাকলীদের ক্ষেত্রে কেন দলীল চাওয়ার প্রয়োজন নেই? সহজ উত্তর- আল্লাহ তা‘আলা দলীল চাইতে বলেন নি তাই চাওয়া যাবে না। তাকলীদের ব্যাপারে পবিত্র কুরআন শরীফে ইরশাদ হয়েছে- فاسئلوا اهل الذكر إن كنتم لا تعلمون
অর্থ্যাৎ- তোমরা যদি কোন বিষয়ে না জান তাহলে যারা জানে তাদের কাছে জেনে নাও।
এই আয়াতে মহান আল্লাহ অজানা বিষয় জানার জন্য বলেছেন, তার জন্য দলীল বা প্রমাণ চাইতে বলেন নি। পবিত্র হাদীস শরীফে আমরা উক্ত আয়াতের বাস্তব চিত্র খুজে পাই। সাহাবায়ে কিরাম কোন অজানা বিষয়ে যিনি জানেন তাকে প্রশ্ন করলে তিনি যা বলতেন তাই মেনে নিতেন। এর জন্য দলীল চাইতেন না।
হাদীস শরীফে বর্ণিত আছে হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে উমর (রা.) কে একবার দুই ব্যাক্তির ঋণ সম্পর্কে মাসআলা জিজ্ঞেস করা হলো যে, প্রথমজন দ্বিতীয়জনের কাছে মেয়াদী ঋণের পাওনাদার। মেয়াদ পূর্ণ হওয়ার আগে ঋণ পরিশোধ করলে আংশিক ঋণ মওকূফে সম্মত হয়েছে। এ ব্যাপারে শরী‘আতের নির্দেশ কি? হযতে উমর (রা.) তা নাকচ করে দিলেন।
হযরত উমর (রা.) নিজ ইজতিহাদ থেকে এই মাসআলা দিয়েছেন। সে জন্যে তিনি দলীল পেশ করারও প্রয়োজনবোধ করেননি, এমনকি প্রশ্ন কর্তাও দলীল জানতে চান নি। বিনা দলীলে মেনে নিয়েছেন। আর বিনা দলীলে মেনে নেওয়ার নামই হলো তাকলীদ।
ফারায়যের গুরুত্বপূর্ণ একটি মাসআলা সম্পর্কে হযরত আলী (রা.) কে প্রশ্ন করা হলো। তখন তিনি মিম্বরের উপর ছিলেন। আলী (রা.) মিম্বরে বসে ফতওয়া দিলেন; তিনি কোন দলীল পেশ করেন নি। প্রশ্নকর্তাও ফতওয়ার পক্ষে কোন দলীল তলব করেননি।
মুসনাদে আহমদে বর্ণিত আছে- জনৈক মহিলা সাহাবী রাসূল (সা.)-এর দরবারে এসে আরজ করলেন-ইয়া রাসূল্লাহ! আমার স্বামী জিহাদে গমন করেছেন। তিনি থাকাবস্থায় আমি নামাযসহ অন্যান্য আমলের ক্ষেত্রে তাকে অনুসরণ করতাম। তিনি ফিরে আসা পর্যন্ত আমাকে এমন আমল শিখিয়ে দিন যা তার আমলের স্থলাভিষিক্ত হয়।
দেখুন! মহিলা সাহাবী তার যাবতীয় আমলের ক্ষেত্রে তার স্বামীর ইকতিদা করেছেন। রাসূল (সা.)ও তা সমর্থন করেছেন।
শরী‘আত সকল মুসলমানদের উপর ফতওয়া প্রদানের দায়িত্ব দেয়নি। একমাত্র কুরআন-হাদীসে পারদর্শীগণ মাসআলা ইস্তিন্ব^াত করবেন, ফতওয়া দিবেন। সাধারণ মুসলমান দলীল না চেয়ে তাদের কথা মেনে নিবেন। এ সম্পর্কে আল্লাহ তা‘আলা ইরশাদ করেন- فلولا نفر من كل فرقة منهم طائفة ليتفقهوا في الدين ولينذروا قومهم اذا رجعوا اليهم لعلهم يحذرون.
অর্থাৎ- দ্বীনী জ্ঞান শিক্ষার জন্য প্রত্যেক দল থেকে একটি উপদল কেন বেরিয়ে পড়ে না, যেন ফিরে এসে ম্বজাতিকে তারা সতর্ক করতে পারে?
এই আয়াতে মহান আল্লাহ মুসলমানদের কিছু অংশকে দ্বীনী শিক্ষায় পান্ডিত্য অর্জনের কথা বলেছেন। যারা শিক্ষা অর্জন করে অবশিষ্ঠ্য মুসলমান; যারা দ্বীনী শিক্ষায় পান্ডিত্য অর্জন করেনি তথা সাধারণ মুসলমানদেরকে নসীহত করবে এবং সাধারণ মুসলমান তাদের কথা মেনে চলবে।
মহান আল্লাহ মুসলমানদের সার্বিক সুবিধার জন্যে এই নির্দেশ দিয়েছেন। কারণ দ্বীনী বিষয়ে গভীর জ্ঞান অর্জন করা সবার পক্ষে সম্ভব নয়। পক্ষান্তরে আহলে হাদীসরা মহান আল্লাহর এই সহজ বিধানকে কঠিন থেকে কঠিনতর করার জন্যে বলে যে সকল মুসলমানের জন্য কুরআন-হাদীসের জ্ঞান অর্জন করতে হবে।
ইসলামের সকল যুগেই দু’ধরনের মুসলমান ছিলেন। আম এবং খাস। মুসলমানদের এক অংশ দ্বীনী বিষয়ে অগাধ জ্ঞান রাখতেন, ইজতিহাদ করতেন এবং সে অনুযায়ী ফতওয়া দিতেন। আর অপর পক্ষ তাদের কথা মেনে নিয়ে আমল করতেন। যেমন
হযরত আব্দুর রহমান ইবনু আউফ (রা.) বিশেষ একপ্রকার মোজা পরতে দেখে উমর (রা.) বলেছিলেন- তোমাকে কসম দিয়ে বলছি তুমি মোজা জোড়া খুলে ফেল। কারণ আমি আশঙ্কা করি সাধারণ লোকজন তোমাকে দেখে তোমার ইকতিদা করবে।
হযতে তালহা (রা.) এর গায়ে রঙ্গিন ইহরাম দেখে হযরত উমর (রা.) বললেন এটা কেন পড়েছে? তালহা (রা.) বললেন এটাতে তো সুগন্ধি নাই। উমর (রা.) বললেন- শুন! তোমরা হলে ইমাম। সাধারণ লোকজন তোমাদের ইকতদা করে। কোন অজ্ঞ লোক তোমার এই কাপড় দেখলে বলবে তালহা ইবনু উবায়দুল্লাহ ইহােম হিসাবে রঙ্গিন কাপড় পড়তেন। (না বুঝে সুগন্ধযুক্ত এবং সুগন্ধহীন উভয় কাপড় পড়া শুরু করবে)। সুতরায় তোমরা এমন কাপড় পড়ো না।
ইসলামের প্রতিটি যুগে সাধারণ মুসলমানদের বিরাট একটি অংশ ছিল। যারা উলামায়ে কেরামের কথা, উক্তি এবং তাদের দেখানো আমল আদর্শ হিসাবে মানতেন এবং তাকলীদ বা অনুসরণ করতেন। কারণ তারা বিশ্বাস করতেন উলামায়ে কিরাম যে ফতওয়া বা আদর্শ আমাদেরকে দিচ্ছেন সেটা অবশ্যই কুরআন এবং হাদীস গবেষণা করেই দিচ্ছেন। এই গবেষনার নাম হচ্ছে ইজতিহাদ।
আহলে হাদীসরা মুসলমানদেরকে তাদের পূর্বসুরীদের পথ এবং মত থেকে সরিয়ে দাজ্জালী ফিতনার মুখোমুখি করার প্রয়াস চালাচ্ছে। তারা সরলমনা মুসলমানদের ধোকা দেওয়ার জন্য বলে পূর্বসুরীদের পথ আকড়ে ধরা হলো কাফিরদের স্বভাব। অথচ কুরআন শরীফে আল্লাহ তা‘লা মুনাফিকদের বৈশিষ্ঠ সম্পর্কে বলেন “আর তারা মুমিনদের (রেখে যাওয়া) পথ ছেড়ে অন্য পথের অনুসরণ করে”।
লা-মাযহাবীরা মুখে যতই বলুক যে তারা তাকলীদ করে না কিন্তু বাস্তবে তাদের প্রতিটি কাজ-কর্মই তাকলীদ অনুযায়ী হচ্ছে। যেমন, আমরা জানি কুরআন শরীফ সাত কিরাআতে নাযিল হয়েছে। বর্তমানে সারা পৃথিবীতেই ইমাম হাফস (র.)-এর কিরাত প্রচলিত আছে। বিশ্বের সকল মুসলমান এ ক্ষেত্রে ইমাম হাফস (র.)-এর তাকলীদ করেন। আহলে হাদীস, লা-মাযহাবী, সালাফীরাও ইমাম হাফসের কিরাআতে পবিত্র কুরআন তিলাওয়াত করেন; এত তারা ইমাম হাফস (র.)-এর তাকলীদ করল।
আহলে হাদীসের প্রতি কিছু প্রশ্ন
আহলে হাদীসরা মাযহাব পন্থী লোকদের ধোকা দেওয়ার জন্য দসব সময় বলে থাকেন কুরআন এবং সহীহ হাদীসে আছে কি না? সে জন্যে নিচে কিছু প্রশ্ন দেওয়া হলো, আহলে হাদীস ভাইগণ উত্তর দিবেন।
১। নামাযসহ শরী‘আতের বিভিন্ন হুকুম-আহকামে যে সমস্ত ফরয, ওয়াজিব, সুন্নত এবং মুস্তাহাব ইত্যাদি পরিভাষা ব্যবহার করা হয়েছে, কুরআন এবং সহীহ হাদীসের আলোকে সেগুলো প্রমাণ করুন।
২। হাদীস শরীফে মানুষের ছবির ব্যাপারে কঠোরভাবে নিষেধাজ্ঞা এসেছে। তারপরও আহলে হাদীস ভাইয়েরা টি.ভি তে অনুষ্ঠান করেন কোন আয়াত এবং সহীহ হাদীসের আলোকে?
৩। পবিত্র হাদীস অনুযায়ী ছবি তোলা হারাম। তাহলে হজ্জের জন্য ছবি তুলা বৈধ হওয়ার ব্যাপারে কুরআন এবং সহীহ হাদীস থেকে প্রমাণ পেশ করুন।
৪। পবিত্র কুরআন তেলাওয়াতের ক্ষেত্রে রাসূল (সা.) কোন কিরাত পড়তেন? ইমাম হাফস (র.)-এর কিরাত রাসূল (সা.)-এর কিরাত কি না? সহীহ হাদীসের আলোকে প্রমাণ করুন। যদি না হয় তাহলে আপনারা রাসূল (সা.) এর কিরাতে পড়েন না কেন?
৫। মোবাইলে বা রেকর্ডে সিজদার আয়াত তিলাওয়াত করলে সিজদা ওয়াজিব হবে কি না? কুরআন এবং সহীহ হাদীস দ্বারা প্রমাণ পেশ করুন।
৬। রাসূল (সা.)-এর যুগে হাদীস সংকলিত হয়েছিল কি না? সহীহ হাদীস দ্বারা প্রমাণ দিন।
তাকলীদ এর আভিধানিক অর্থ গলায় হার পরানো। শরী‘আতের পরিভাষায় তাকলীদ হলো নির্ভরযোগ্য আলিম এর মতামতকে সঠিক জেনে দলীল তলব না করে মানার নাম তাকলীদ।
দলীল-প্রমাণ না চেয়ে আলিমের রায় মেনে নেওয়াই হলো তাকলীদ। সালাফে সালেহীন তথা আহলে সুন্নাত ওয়াল জামা‘আতের উলামোয়ে কিরাম যুগ যুগ ধরে আইম্মায়ে আরবা‘আ (ইমাম আবূ হানিফা, ইমাম মালিক, ইমাম শাফেঈ, ইমাম আহমদ বিন হাম্বল) এর কোন কোন এক ইমামের তাকলীদ করে আসছেন। এমনকি নব্যপ্রসূত লা-মাযহাবীরা হাদীসের ক্ষেত্রে যে শায়খুল ইসলাম ইবনে তাইমিয়াকে অনুসরণ করে তিনিও তাকলীদে বিশ্বাস করতেন এবং মানতেন। তার ছাত্র ইবনু কাইয়িম আল জাওযিয়্যাহও মাযহাব মানতেন। ইবনু তাইমিয়ার মাযহাব সম্পর্কে আহলে হাদীসদের অন্যতম আলেম সিদ্দিক হাসান তাঁর “আল-জুন্নাহ” কিতাবের ৩৮ পৃষ্টায় বলেন- শায়খূল ইসলাম ইমাম ইবনু তাইমিয়া হাম্বলী মাযহাবের অনুসারী ছিলেন। তার ছাত্র ইবনু কাইয়িমও হাম্বলী মাযহাবের অনুসারী ছিলেন।
ইবনু তাইমিয়া এবং ইবনু কাইয়িম আল জাওযিয়্যাহ এর মাযহাব হাম্বলী হওয়ার ব্যাপারে কোন সন্দেহ নাই। তাঁর লিখিত “মাজমুআতুল ফাতাওয়া” এর প্রমাণ বহন করে।
প্রশ্ন হলো তাকলীদের ক্ষেত্রে কেন দলীল চাওয়ার প্রয়োজন নেই? সহজ উত্তর- আল্লাহ তা‘আলা দলীল চাইতে বলেন নি তাই চাওয়া যাবে না। তাকলীদের ব্যাপারে পবিত্র কুরআন শরীফে ইরশাদ হয়েছে- فاسئلوا اهل الذكر إن كنتم لا تعلمون
অর্থ্যাৎ- তোমরা যদি কোন বিষয়ে না জান তাহলে যারা জানে তাদের কাছে জেনে নাও।
এই আয়াতে মহান আল্লাহ অজানা বিষয় জানার জন্য বলেছেন, তার জন্য দলীল বা প্রমাণ চাইতে বলেন নি। পবিত্র হাদীস শরীফে আমরা উক্ত আয়াতের বাস্তব চিত্র খুজে পাই। সাহাবায়ে কিরাম কোন অজানা বিষয়ে যিনি জানেন তাকে প্রশ্ন করলে তিনি যা বলতেন তাই মেনে নিতেন। এর জন্য দলীল চাইতেন না।
হাদীস শরীফে বর্ণিত আছে হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে উমর (রা.) কে একবার দুই ব্যাক্তির ঋণ সম্পর্কে মাসআলা জিজ্ঞেস করা হলো যে, প্রথমজন দ্বিতীয়জনের কাছে মেয়াদী ঋণের পাওনাদার। মেয়াদ পূর্ণ হওয়ার আগে ঋণ পরিশোধ করলে আংশিক ঋণ মওকূফে সম্মত হয়েছে। এ ব্যাপারে শরী‘আতের নির্দেশ কি? হযতে উমর (রা.) তা নাকচ করে দিলেন।
হযরত উমর (রা.) নিজ ইজতিহাদ থেকে এই মাসআলা দিয়েছেন। সে জন্যে তিনি দলীল পেশ করারও প্রয়োজনবোধ করেননি, এমনকি প্রশ্ন কর্তাও দলীল জানতে চান নি। বিনা দলীলে মেনে নিয়েছেন। আর বিনা দলীলে মেনে নেওয়ার নামই হলো তাকলীদ।
ফারায়যের গুরুত্বপূর্ণ একটি মাসআলা সম্পর্কে হযরত আলী (রা.) কে প্রশ্ন করা হলো। তখন তিনি মিম্বরের উপর ছিলেন। আলী (রা.) মিম্বরে বসে ফতওয়া দিলেন; তিনি কোন দলীল পেশ করেন নি। প্রশ্নকর্তাও ফতওয়ার পক্ষে কোন দলীল তলব করেননি।
মুসনাদে আহমদে বর্ণিত আছে- জনৈক মহিলা সাহাবী রাসূল (সা.)-এর দরবারে এসে আরজ করলেন-ইয়া রাসূল্লাহ! আমার স্বামী জিহাদে গমন করেছেন। তিনি থাকাবস্থায় আমি নামাযসহ অন্যান্য আমলের ক্ষেত্রে তাকে অনুসরণ করতাম। তিনি ফিরে আসা পর্যন্ত আমাকে এমন আমল শিখিয়ে দিন যা তার আমলের স্থলাভিষিক্ত হয়।
দেখুন! মহিলা সাহাবী তার যাবতীয় আমলের ক্ষেত্রে তার স্বামীর ইকতিদা করেছেন। রাসূল (সা.)ও তা সমর্থন করেছেন।
শরী‘আত সকল মুসলমানদের উপর ফতওয়া প্রদানের দায়িত্ব দেয়নি। একমাত্র কুরআন-হাদীসে পারদর্শীগণ মাসআলা ইস্তিন্ব^াত করবেন, ফতওয়া দিবেন। সাধারণ মুসলমান দলীল না চেয়ে তাদের কথা মেনে নিবেন। এ সম্পর্কে আল্লাহ তা‘আলা ইরশাদ করেন- فلولا نفر من كل فرقة منهم طائفة ليتفقهوا في الدين ولينذروا قومهم اذا رجعوا اليهم لعلهم يحذرون.
অর্থাৎ- দ্বীনী জ্ঞান শিক্ষার জন্য প্রত্যেক দল থেকে একটি উপদল কেন বেরিয়ে পড়ে না, যেন ফিরে এসে ম্বজাতিকে তারা সতর্ক করতে পারে?
এই আয়াতে মহান আল্লাহ মুসলমানদের কিছু অংশকে দ্বীনী শিক্ষায় পান্ডিত্য অর্জনের কথা বলেছেন। যারা শিক্ষা অর্জন করে অবশিষ্ঠ্য মুসলমান; যারা দ্বীনী শিক্ষায় পান্ডিত্য অর্জন করেনি তথা সাধারণ মুসলমানদেরকে নসীহত করবে এবং সাধারণ মুসলমান তাদের কথা মেনে চলবে।
মহান আল্লাহ মুসলমানদের সার্বিক সুবিধার জন্যে এই নির্দেশ দিয়েছেন। কারণ দ্বীনী বিষয়ে গভীর জ্ঞান অর্জন করা সবার পক্ষে সম্ভব নয়। পক্ষান্তরে আহলে হাদীসরা মহান আল্লাহর এই সহজ বিধানকে কঠিন থেকে কঠিনতর করার জন্যে বলে যে সকল মুসলমানের জন্য কুরআন-হাদীসের জ্ঞান অর্জন করতে হবে।
ইসলামের সকল যুগেই দু’ধরনের মুসলমান ছিলেন। আম এবং খাস। মুসলমানদের এক অংশ দ্বীনী বিষয়ে অগাধ জ্ঞান রাখতেন, ইজতিহাদ করতেন এবং সে অনুযায়ী ফতওয়া দিতেন। আর অপর পক্ষ তাদের কথা মেনে নিয়ে আমল করতেন। যেমন
হযরত আব্দুর রহমান ইবনু আউফ (রা.) বিশেষ একপ্রকার মোজা পরতে দেখে উমর (রা.) বলেছিলেন- তোমাকে কসম দিয়ে বলছি তুমি মোজা জোড়া খুলে ফেল। কারণ আমি আশঙ্কা করি সাধারণ লোকজন তোমাকে দেখে তোমার ইকতিদা করবে।
হযতে তালহা (রা.) এর গায়ে রঙ্গিন ইহরাম দেখে হযরত উমর (রা.) বললেন এটা কেন পড়েছে? তালহা (রা.) বললেন এটাতে তো সুগন্ধি নাই। উমর (রা.) বললেন- শুন! তোমরা হলে ইমাম। সাধারণ লোকজন তোমাদের ইকতদা করে। কোন অজ্ঞ লোক তোমার এই কাপড় দেখলে বলবে তালহা ইবনু উবায়দুল্লাহ ইহােম হিসাবে রঙ্গিন কাপড় পড়তেন। (না বুঝে সুগন্ধযুক্ত এবং সুগন্ধহীন উভয় কাপড় পড়া শুরু করবে)। সুতরায় তোমরা এমন কাপড় পড়ো না।
ইসলামের প্রতিটি যুগে সাধারণ মুসলমানদের বিরাট একটি অংশ ছিল। যারা উলামায়ে কেরামের কথা, উক্তি এবং তাদের দেখানো আমল আদর্শ হিসাবে মানতেন এবং তাকলীদ বা অনুসরণ করতেন। কারণ তারা বিশ্বাস করতেন উলামায়ে কিরাম যে ফতওয়া বা আদর্শ আমাদেরকে দিচ্ছেন সেটা অবশ্যই কুরআন এবং হাদীস গবেষণা করেই দিচ্ছেন। এই গবেষনার নাম হচ্ছে ইজতিহাদ।
আহলে হাদীসরা মুসলমানদেরকে তাদের পূর্বসুরীদের পথ এবং মত থেকে সরিয়ে দাজ্জালী ফিতনার মুখোমুখি করার প্রয়াস চালাচ্ছে। তারা সরলমনা মুসলমানদের ধোকা দেওয়ার জন্য বলে পূর্বসুরীদের পথ আকড়ে ধরা হলো কাফিরদের স্বভাব। অথচ কুরআন শরীফে আল্লাহ তা‘লা মুনাফিকদের বৈশিষ্ঠ সম্পর্কে বলেন “আর তারা মুমিনদের (রেখে যাওয়া) পথ ছেড়ে অন্য পথের অনুসরণ করে”।
লা-মাযহাবীরা মুখে যতই বলুক যে তারা তাকলীদ করে না কিন্তু বাস্তবে তাদের প্রতিটি কাজ-কর্মই তাকলীদ অনুযায়ী হচ্ছে। যেমন, আমরা জানি কুরআন শরীফ সাত কিরাআতে নাযিল হয়েছে। বর্তমানে সারা পৃথিবীতেই ইমাম হাফস (র.)-এর কিরাত প্রচলিত আছে। বিশ্বের সকল মুসলমান এ ক্ষেত্রে ইমাম হাফস (র.)-এর তাকলীদ করেন। আহলে হাদীস, লা-মাযহাবী, সালাফীরাও ইমাম হাফসের কিরাআতে পবিত্র কুরআন তিলাওয়াত করেন; এত তারা ইমাম হাফস (র.)-এর তাকলীদ করল।
আহলে হাদীসের প্রতি কিছু প্রশ্ন
আহলে হাদীসরা মাযহাব পন্থী লোকদের ধোকা দেওয়ার জন্য দসব সময় বলে থাকেন কুরআন এবং সহীহ হাদীসে আছে কি না? সে জন্যে নিচে কিছু প্রশ্ন দেওয়া হলো, আহলে হাদীস ভাইগণ উত্তর দিবেন।
১। নামাযসহ শরী‘আতের বিভিন্ন হুকুম-আহকামে যে সমস্ত ফরয, ওয়াজিব, সুন্নত এবং মুস্তাহাব ইত্যাদি পরিভাষা ব্যবহার করা হয়েছে, কুরআন এবং সহীহ হাদীসের আলোকে সেগুলো প্রমাণ করুন।
২। হাদীস শরীফে মানুষের ছবির ব্যাপারে কঠোরভাবে নিষেধাজ্ঞা এসেছে। তারপরও আহলে হাদীস ভাইয়েরা টি.ভি তে অনুষ্ঠান করেন কোন আয়াত এবং সহীহ হাদীসের আলোকে?
৩। পবিত্র হাদীস অনুযায়ী ছবি তোলা হারাম। তাহলে হজ্জের জন্য ছবি তুলা বৈধ হওয়ার ব্যাপারে কুরআন এবং সহীহ হাদীস থেকে প্রমাণ পেশ করুন।
৪। পবিত্র কুরআন তেলাওয়াতের ক্ষেত্রে রাসূল (সা.) কোন কিরাত পড়তেন? ইমাম হাফস (র.)-এর কিরাত রাসূল (সা.)-এর কিরাত কি না? সহীহ হাদীসের আলোকে প্রমাণ করুন। যদি না হয় তাহলে আপনারা রাসূল (সা.) এর কিরাতে পড়েন না কেন?
৫। মোবাইলে বা রেকর্ডে সিজদার আয়াত তিলাওয়াত করলে সিজদা ওয়াজিব হবে কি না? কুরআন এবং সহীহ হাদীস দ্বারা প্রমাণ পেশ করুন।
৬। রাসূল (সা.)-এর যুগে হাদীস সংকলিত হয়েছিল কি না? সহীহ হাদীস দ্বারা প্রমাণ দিন।
এতে সদস্যতা:
পোস্টগুলি (Atom)