শনিবার, ৭ মার্চ, ২০১৫

তাঁর চেহারা ছিল জ্যোতির্ময়


মুহাম্মদ মাহমুদুল হাসান
রাসূলে আরাবী (সা.)-এর চেহারার বর্ণনায় বুখারী শরীফে হযরত আবূ হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত আছে যে, নবীয়ে আকরাম (সা.) এর চেহারা পৃথিবীর সকল মানুষ থেকে অধিক সুন্দর ছিল। তার সেই নূরানী চেহারাতে যেন সূর্যের আলো বিচ্ছুরিত হতো। (তিরমিযী)
মহান আল্লাহ তা‘আলা হলেন সকল সুন্দর্যের আধার। আল্লাহ নিজে সুন্দর, তিনি সুন্দরকে পছন্দ করেন। সকল রূপ-সৌন্দর্যের ¯্রষ্টা, যিনি সুন্দরকে ভালোবাসেন তিনি তার হাবীবকে কেমন সুন্দর্য দিয়ে সৃষ্টি করেছেন? কেমন রূপের বাহার ছিল তার মাহবূবের চেহারাতে? হাদীসে কুদসীতে বলা হয়েছে, আমি ছিলাম গুপ্ত ভান্ডার। আমি ইচ্ছা করলাম প্রকাশিত হওয়ার, আর সে জন্যে আমি এক মাখলূক সৃষ্টি করলাম যার নাম দিলাম মুহাম্মদ (সা.)।
মহান আল্লাহ তার যাত-সিফাত, জামাল-কামাল কে প্রকাশিত করার জন্যে মুহাম্মদ (সা.) কে সৃষ্টি করেছেন। তাহলে মহান আল্লাহর সেই জামাল কেমন রূপে তার হাবীবের মধ্যে প্রকাশিত হয়েছিল?
ইবনে আসাকির জাবির (রা.)-এর সূত্রে বর্ণনা করেন, রাসূল (সা.) ইরশাদ করেছেন- আমার কাছে জিবরাঈল (আ.) এসে বললেন আল্লাহ পাক আপনাকে সালাম দিয়েছেন। আর বলেছেন- হে আমার হাবীব! আমি নবী ইউসুফ (আ.) কে আমার কুরসীর নূর দ্বারা সুন্দরর্যমন্ডিত করেছি। আর আপনার চেহরায়ে আনওয়ারে আমার আরশের নূর প্রদান কিেছ। (খাসায়িসুল কুবরা)
হযরত আয়শা সিদ্দিকা (রা.) বলেন-
لواحي زليخا لو رأين جبينه + لأثرن بالتقطيع الصدور علي اليد
-যদি যুলায়খার সঙ্গী-সাথীরা আমার নবীর নূরানী চেহারা দেখত, তাহলে তাদের নিজ হাতে তাদের কলিজা কেটে দিত। (খাসায়িস)
প্রিয় নবীর একান্ত সহচর গারে সূরের সাথী হযরত আবূ বকর (রা.) বলেন-
كان وجه رسول الله صلي الله عليه وسلم كأنه دارة
-রাসূল (সা.)-এর চেহারা যেন একরাশ তারকার ন্যায় ছিল।
নূরে মুজাস্সাম হাবীবে কিবরিয়া (সা.)-এর চেহারার সুন্দর্য সম্পর্কে সাহাবায়ে কেরামের বর্ণনা হলো- তার চেহারা ছিল উজ্জলতম, পুষ্পিত আলোকময়, দৃশ্যমান এক জ্যোতি, পূর্ণিমার রাতের আলার ন্যায় ঝলমলে। হযরত জাবির (রা.) এক পূর্ণিমার রজনীতে রাসূল (সা.) এর চেহারার দিকে তাকাচ্ছিলেন। তিনি বলেন আমি একবার প্রিয়নবীর চেহারার দিকে তাকাই আরেকবার আকাশের চন্দ্রের দিকে তাকাই। অবশেষে আমি এটা নিশ্চিত হলাম যে রাসূলে আকরাম (সা.)-এর চেহারা পূর্ণিমার চাঁদের চেয়েও বেশি সুন্দর।
অন্ধকার আলোতে প্রিয়নবীর চেহারার বর্ণনা দিতে গিয়ে হযরত আয়শা সিদ্দিকা (রা.) বলেন-
আমি রাতের বেলা সেলাই করছিলাম। হঠ্যাৎ আমার হাত থেকে সূঁই পড়ে গেল। অনেক খোঁজাখোঁজি করেও সুঁই পাইনি। এমন সময় রাসূল (সা.) আমার ঘরে তাশরীফ আনেন। তার আলোকোজ্জল চেহারার আলোতে আমি আমার সুঁই পেয়ে যাই।
আল্লাহ তা‘আলা মহানবী (সা.)-এর মধ্যে জাহেরী-বাতেনী সকল ধরনের সৌন্দর্যের সমাহার ঘটিয়েছেন, যা পৃথিবীর আদি থেকে অন্ত পর্যন্ত কারো মধ্যে ঘটান নি। তার মধ্যে বাতেনী সুন্দর্যের মতো জাহেরী সুন্দের্যের অনন্য সমাহার ছিল। প্রিয়নবীর সেই জাহেরী সুন্দর্য দেখে অসংখ্য কাফের মুসলমান হয়েছে। সাহাবায়ে কেরাম রাসূল (সা.)-এর জাহেরী সুন্দর্য চর্মচক্ষে অবলোকন করেছেন। যার জন্য তারা রাসূল (সা.)-এর পদ্বতলে তাদের জীবন কুরবান করে দিয়েছেন। এমনকি উদ্ভিদ-প্রাণীরাও তার ভালোবাসায় প্রাণ উৎসর্গ করেছে। বিদায় হজ্জের দিন রাসূল (সা.) ৬৩ টি কুরবানী নিজ হাতে দিয়েছেন। কুরবানীর উটগুলো রাসূল (সা.)-এর প্রিয় হাতে তাদের জীবন উৎসর্গ করার জন্য প্রতিযোগিতা শুরু করেছিল, কার আগে কে কুরবানী হবে। প্রিয়নবীর ইন্তেকালের পর তার নূরানী চেহারার দর্শন না পেয়ে বেদনায় তার গাধাটি কূপের মধ্যে পড়ে প্রাণ দিয়ে দেয়। রাসূল (সা.)-এর উষ্ট্রি খাওয়া দাওয়া ছেড়ে দেয়। অবশেষে মারা যায়।
কি অলৌকিক আকর্ষন ছিল তার চেহারায়? ক্ষুধার তীব্র যন্ত্রনা নিয়ে সাহাবায়ে কিরাম তার মজলিসে বসতেন। নবীজীর নূরানী চেহারার দিকে তাকিয়ে তারা তাদের ক্ষুধাকে নিভৃত করতেন। শত দুঃখ, কষ্ঠ, যন্ত্রনা দূর করতেন। এক মহিলা সাহাবীর স্বামী, দুই সন্তান জিহাদের ময়দানে শহীদ হয়েছেন। কিন্তু তিনি সে দিকে ভ্রুক্ষেপ করেননি। তিনি বার বার বলতেছিলেন আমার নবীর অবস্থা কি? তিনি কেমন আছেন? (সুবহানাল্লাহ)
রাবী‘ বিনতে মুআওয়িয বলেন- لو رأيته لرأيت الشمس طالعة
-আমি যখন রাসূল (সা.)-এর দিকে তাকাতাম তখন মনে হতো যেন উদিত সূর্যের দিকে তাকাচ্ছি। (তিরমিযী)
হযরত আবূ তোফায়ল (রা.) বলেন-
كان أبيض مليح الوجه مرأة وكأن البدر يري في وجهه.
-রাসূল (সা.) ছিলেন শুভ্র এবং লাবন্যময় চেহারার অধিকারী। তিনি যখন আনন্দিত হতেন তখন তার চেহারায় যেন পূর্ণিমার চাঁদ দেখা যেত। (মুসলিম)
হাবীবে খোদার জামাল-কামালের সরাসরি প্রত্যক্ষকারী সাহাবায়ে কেরাম তাদের কবিতায় নবীর সৌন্দর্যের অতুলনীয় বিবরণ দিয়েছেন।
নবীয় আকরাম (সা.)-এর সুন্দর্যের বর্ণনায় হযরত হাসসান বিন ছাবিত (রা.) বলেন-
أحسن منك لم تري قط عين + وأجمل منك لم تلد النساء
-আপনার চেয়ে সুন্দর কোন মানুষ আমার চোখ দেখেনি, আর আপনার চেয়ে অধিক সুন্দর শিশু কোন নারী জন্ম দেয়নি।
হযরত কা’ব বিন যুহায়র (রা.) বলেন-
إن الرسول لنور يستضاء به + مهند من سيوف الله مسلول
-নিশ্চয়ই রাসূল (সা.) হলেন নূর, তার থেকে সবি আলোকিত হয়। তিনি আল্লাহর ধারালো তরবারী।
হযরত হাসান ইবনু আলী (রা.) বলেন-
فخما مفخما يتلألأ وجهه صلي الله عليه وسلم تلألؤ القمر ليلة البدر
-রাসূল (সা.) ছিলেন সম্মান ও মর্যাদার আধাঁর, পূর্ণিমার চাঁদের আলোর ন্যায় তার চেহারা থেকে নূর বিচ্ছূরিত হতো।
জনৈকা মহিলা নবীজীর চেহারার বর্ণনা দিতে গিয়ে বলেন- তার চেহারা ছিল পূর্ণিমার রজনীর চাঁদের ন্যায়। আমি ইতোপূর্বে তার মতো কাউকে দেখিনি, পরেও দেখিনি। (তিরমিযী)
হযরত আয়শা (রা.) বলেন-
إذا سر تبرق أسارير وجهه كأنه قطعة قمر
রাসূল (সা.) যখন আনন্দিত হতেন তখন তার চেহারা অধিক উজ্জল হতো, দেখলে মনে হতো যেন নক্ষত্রের এক টুকরো।
নবীজীর সৌন্দর্যের বর্ণনায় উম্মে মা’বাদ (রা.) বলেন-
এসেছিলেন মোদের ঘরে এক মোবারক মেহমান
এসেছিলেন খিমায় মোদের রূপ জগতের রাজ কুমার
লাবণ্যময় স্বর্ণ উজাল মধ্য তনুকান্তি তাঁর
সতেজ সুঠাম শোভন দেহ প্রশস্ত স্কন্ধদ্বয়
যুক্ত ভুরু গ্রীবা দীঘল চওড়া ললাট জ্যোতির্ময়
সরল সোজা উচ্চনাতি টিকালো নাক মন মোহন
গোলাপ রাঙা অধর যুগল টশটশে বেশ সুদর্শন
মুন্ড সুগোল দর্শনীয় বিনয়নত উচ্চশির
চিত্তহারি কুসুম কোমল অঙ্গে সুবাস কস্তুরির।
(কাব্যানুবাদ: কবি রূহুল আমীন খান)

কুরআন ও সুন্নাহর আলোকে তাকলীদের প্রয়োজনীয়তা

মুফতী মাওলানা মো: গিয়াস উদ্দিন চৌধুরী ফুলতলী
কুরআন, সুন্নাহ এবং কুরআন-সুন্নাহর আলোকে সংঘটিত ইজমা ও কিয়াস-এ চারটি মূলনীতি হচ্ছে দীন ও শরীআতের যাবতীয় বিধি বিধানের মাপকাঠি। কিন্তু কুরআন সুন্নাহতে বর্ণিত আহকামসমূহের প্রত্যেকটি সমান নয়। কিছু কিছু আহকাম হচ্ছে স্পষ্ট ও বিরোধমুক্ত। যেমন নামায ফরয হওয়া, রোযা ফরয হওয়া, হজ্জ ফরয হওয়া, যিনা নিষিদ্ধ হওয়া, মদ খাওয়া ও চুরি করা নিষিদ্ধ হওয়া ইত্যাদি। এগুলোর উপর আমলের জন্য কোন প্রকার চিন্তা গবেষণার প্রয়োজন নেই।
পক্ষান্তরে কিছু কিছু আহকাম হচ্ছে এমন যে, এগুলো সম্পর্কে বর্ণিত আয়াত বা হাদীস অস্পষ্ট, সংক্ষিপ্ত বা আপাত:দৃষ্টিতে বিরোধপূর্ণ। যেমন- আল্লাহ তা’আলার বাণী: وَالْمُطَلَّقَاتُ يَتَرَبَّصْنَ بِأَنْفُسِهِنَّ ثَلَاثَةَ قُرُوءٍ আলোচ্য আয়াতে قُرُوءٍ শব্দটি দুইটি অর্থে মুশতারাক। একটি হলো حيض (ঋতুস্রাব), অপরটি হলো طهر (পবিত্রতা)। সুতরাং এখানে শব্দটি কোন অর্থে গৃহীত হবে সে বিষয়ে চিন্তা-গবেষণার প্রয়োজন আছে।
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর হাদীস:
مَنْ لم يترك المخابرة فليأذَن بِحَرب من الله ورسوله. (جامع الأصول في أحاديث الرسول)
অর্থাৎ যে মুখাবারা বা বর্গা ব্যবস্থা পরিহার করে না সে যেন আল্লাহ ও রাসূলের সাথে যুদ্ধে নামার ঝুঁকি নেয়।
এ হাদীস থেকে আমভাবে বর্গা প্রথা নিষিদ্ধ বুঝা যাচ্ছে। কিন্তু সকল বর্গাই নিষিদ্ধ নাকি এর বিশেষ কোন প্রকার নিষিদ্ধ তা এখানে সুস্পষ্ট নয়।
অন্য হাদীসে আছে-  مَنْ كَانَ لَهُ إِمَامٌ فَقِرَاءَةُ الإِمَامِ لَهُ قِرَاءَةٌ . (إتحاف الخيرة المهرة) অর্থাৎ যে ইমামের পেছনে নামায পড়বে, ইমামের কিরাত তার জন্য যথেষ্ট হবে। অপরদিকে অন্য হাদীসে এসেছে-
لاَ صَلاَةَ لِمَنْ لَمْ يَقْرَأْ بِفَاتِحَةِ الْكِتَابِ. (إتحاف الخيرة المهرة)
অর্থাৎ যে সূরা ফাতিহা পড়েনি তার নামায শুদ্ধ হয়নি।
আলোচ্য হাদীসদ্বয় আপাতদৃষ্টিতে বিরোধপূর্ণ হওয়ায় কোন হাদীসের উপর আমল করা যাবে তা স্পষ্ট নয় এবং স্বাভাবিক ইলম দ্বারা তা বুঝাও সম্ভব নয়।
এ ধরণের জটিল সমস্যার ক্ষেত্রে আমলের জন্য দুটি পথ। প্রথমত: নিজেদের জ্ঞান বুদ্ধি ও প্রজ্ঞার উপর নির্ভর করে ফয়সালা করা। দ্বিতীয়ত: এ ব্যাপারে পূর্বসূরীগণের প্রজ্ঞাপূর্ণ সিদ্ধান্তের আলোকে আমল করা। এ ক্ষেত্রে দ্বিতীয় পথই সাধারণ মানুষ ও অমুজতাহিদ আলিমের জন্য অপরিহার্য। তা না হলে ভুল সিদ্ধান্তে উপনীত হওয়ার সমূহ সম্ভাবনা থাকে। আর এরূপ মাসআলায় নির্দ্বিধায় কোন মুজতাহিদের অনুসরণ করার নামই হচ্ছে তাকলীদ।
জটিল মাসআলায় সাধারণ লোকদের তাকলীদ ছাড়া কোন পথই নেই। তাদেরকে পূর্বসূরী প্রজ্ঞাশীল কোন মুজতাহিদকে অনুসরণ করতেই হবে। পবিত্র কুরআন ও হাদীসে এরূপ তাকলীদের সরাসরি নির্দেশ দেয়া হয়েছে।

কুরআন মজীদে তাকলীদের দলীল
১। আল্লাহ পাক ইরশাদ করেন-
 يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا أَطِيعُوا اللهَ وَأَطِيعُوا الرَّسُولَ وَأُولِي الْأَمْرِ مِنْكُمْ .
অর্থাৎ হে ঈমানদারগণ! তোমরা আল্লাহর আনুগত্য কর, রাসূলের আনুগত্য কর এবং উলুল আমর এর আনুগত্য কর। (সূরা নিসা- ৫৯)
উক্ত আয়াতেأُولِي الْأَمْرِ  বলতে কারা- এর ব্যাখ্যায় মুফাসসিরীনে কিরাম প্রায় সকলেই বলেছেন, এরা হলেন কুরআন সুন্নাহ’র ইলমের অধিকারী ফকীহ ও মুজতাহিদগণ।
২। পবিত্র কুরআনের অন্য আয়াতে আছে-
وَإِذَا جَاءَهُمْ أَمْرٌ مِنَ الْأَمْنِ أَوِ الْخَوْفِ أَذَاعُوا بِهِ وَلَوْ رَدُّوهُ إِلَى الرَّسُولِ وَإِلَى أُولِي الْأَمْرِ مِنْهُمْ لَعَلِمَهُ الَّذِينَ يَسْتَنْبِطُونَهُ مِنْهُمْ .
অর্থাৎ যখন তাদের কাছে শান্তি অথবা ভীতি সংক্রান্ত কোন সংবাদ আসে, তখন তারা তা প্রচারে লেগে যায়। অথচ যদি (তারা তা না করে) বিষয়টি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ও উলুল আমর এর কাছে ছেড়ে দিত, তাহলে ইস্তিম্বাতে পারদর্শী তথা সূক্ষ্ম জ্ঞানের অধিকারীগণ এর রহস্য উদঘাটন করতে পারতেন। (সূরা নিসা- ৮৩)
উক্ত আয়াত যুদ্ধ সম্পর্কে নাযিল হলেও একথা সর্বজনস্বীকৃত যে, পবিত্র কুরআনের কোন আয়াতের শানে নুযুল খাস হলেও এর উপর আমল আম। এ আয়াত দ্বারা প্রতীয়মান হয় যে, কোন জটিল বিষয়ে হুট করে সিদ্ধান্ত নেয়ার পরিবর্তে বিজ্ঞ লোকদের প্রজ্ঞাশীল সিদ্ধান্তের অনুসরণ ও তাকলীদ করা আবশ্যক।
৩। অন্য আয়াতে আল্লাহ পাক ইরশাদ করেন-
فَلَوْلَا نَفَرَ مِنْ كُلِّ فِرْقَةٍ مِنْهُمْ طَائِفَةٌ لِيَتَفَقَّهُوا فِي الدِّينِ وَلِيُنْذِرُوا قَوْمَهُمْ إِذَا رَجَعُوا إِلَيْهِمْ لَعَلَّهُمْ يَحْذَرُونَ
Ñপ্রত্যেক দল থেকে এক একটি ছোট দল ধর্মের গভীর জ্ঞান অর্জনের জন্য কেন বেরিয়ে পড়ে না, যাতে তারা যখন তাদের কওমের কাছে ফিরে আসবে তখন তাদেরকে ভীতি প্রদর্শন করবে, যেন তারা সতর্ক হয়। (সূরা তাওবাহ- ১২২)
উক্ত আয়াতে ধর্মের গভীর জ্ঞান অর্জনের জন্য একদল লোককে নির্দেশ দেয়া হয়েছে। আর কওমের বাকী লোক যারা এ জ্ঞান অর্জনের সুযোগ লাভ করতে পারেনি তাদেরকে ঐ ফকীহদের আনুগত্য বা তাকলীদের নির্দেশ দেয়া হয়েছে।
৪। আল্লাহ তাআলার বাণী- فَاسْأَلُوا أَهْلَ الذِّكْرِ إِنْ كُنْتُمْ لَا تَعْلَمُونَ অর্থাৎ তোমরা যদি না জান তাহলে আহলে ইলমদের কাছ থেকে জেনে নাও। (সূরা নহল- ৪৩, আম্বিয়া- ০৭)
আলোচ্য আয়াতে আল্লাহ সকলকে কুরআন হাদীস থেকে সরাসরি ফতওয়া বের করার নির্দেশ না দিয়ে বরং কুরআন হাদীসের ইলমে পারদর্শী লোকদের কাছ থেকে অজ্ঞ লোকদের জেনে নেয়ার নির্দেশ দিয়েছেন। তাকলীদের মূল কথাও হলো তাই।

হাদীস শরীফ থেকে তাকলীদের দলীল
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর অসংখ্য হাদীস থেকে অপেক্ষাকৃত বিজ্ঞ আলিমের কাছে ফতওয়া তলব ও তদনুযায়ী আমল করার নির্দেশ ও প্রমাণ পাওয়া যায়। উদাহরণ স্বরূপ এখানে কয়েকটি হাদীস উল্লেখ করা হল।
০১। হাদীস শরীফে আছে-
عَنْ حُذَيْفَةَ قَالَ كُنَّا عِنْدَ النَّبِيِّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ جُلُوسًا فَقَالَ إِنِّي لَا أَدْرِي مَا قَدْرُ بَقَائِي فِيكُمْ فَاقْتَدُوا بِالَّذَيْنِ مِنْ بَعْدِي وَأَشَارَ إِلَى أَبِي بَكْرٍ وَعُمَرَ.
-হযরত হুযায়ফা (রা.) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেন- জানি না আমি আর কতদিন তোমাদের মধ্যে থাকব। সুতরাং তোমরা আমার পরবর্তীদের অনুসরণ করবে। একথা বলে তিনি আবূ বকর ও উমর (রা.)-এর প্রতি ইঙ্গিত করেছেন। (তিরমিযী, ইবনে মাজাহ, মুসনাদে ইমাম আহমদ)
উক্ত হাদীসে ‘ইকতিদা’ শব্দের ব্যবহার হয়েছে। যার অর্থ শরীআতের বিষয়সমূহে কেউ কারো অনুসরণ করা।
০২। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেন-
مَنْ أُفْتِىَ بِغَيْرِ عِلْمٍ كَانَ إِثْمُهُ عَلَى مَنْ أَفْتَاهُ.
অর্থাৎ যে না জেনে ফতওয়া প্রদান করবে, এর পাপ ফতওয়াদাতার উপরই পতিত হবে।
লক্ষ্যণীয় যে, এখানে ফতওয়ার দায়-দায়িত্ব ফতওয়াদাতার উপর চাপানো হয়েছে। কিন্তু তার ফতওয়া অনুযায়ী যারা আমল করেছেন তাদেরকে দোষারোপ করা হয়নি। আবার অনুসরণকারীদেরকে যাচাই বাছাই করে ফতওয়া গ্রহণের নির্দেশও দেয়া হয়নি। এরূপ হলে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ফতওয়াদাতা ও আমলকারী উভয়কে সমানভাবে দোষারোপ করতেন। এতে বুঝা যায় একদল লোক কেবল তাকলীদ করবেন এবং তাদের তাকলীদ করা শুদ্ধ হবে।
০৩। কোন কোন সাহাবী নামাযের জামাতে দেরিতে এসে পেছনে দাঁড়ালে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাদেরকে প্রথমে এসে প্রথম কাতারে দাঁড়ানোর তাকীদ দিয়ে ইরশাদ করেন-
ائْتَمُّوا بِي وَلْيَأْتَمَّ بِكُمْ مَنْ بَعْدَكُمْ
অর্থাৎ তোমরা আমার অনুসরণ কর আর তোমাদের পরবর্তীরা তোমাদের অনুসরণ করবে।
[সূত্র : মুফতী মাওলানা মো: গিয়াস উদ্দিন চৌধুরী ফুলতলী কৃত ‘তাকলীদের সুদৃঢ় রজ্জু’]

বুধবার, ৪ মার্চ, ২০১৫

তাকলীদ ও আহলে হাদীস

মাহমুদুল হাসান
তাকলীদ এর আভিধানিক অর্থ গলায় হার পরানো শরীআতের পরিভাষায় তাকলীদ হলো নির্ভরযোগ্য আলিম এর মতামতকে সঠিক জেনে দলীল তলব না করে মানার নাম তাকলীদ
দলীল-প্রমাণ না চেয়ে আলিমের রায় মেনে নেওয়াই হলো তাকলীদসালাফে সালেহীন তথা আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাআতের উলামোয়ে কিরাম যুগ যুগ ধরে আইম্মায়ে আরবাআ (ইমাম আবূ হানিফা, ইমাম মালিক, ইমাম শাফেঈ, ইমাম আহমদ বিন হাম্বল) এর কোন কোন এক ইমামের তাকলীদ করে আসছেন এমনকি নব্যপ্রসূত লা-মাযহাবীরা হাদীসের ক্ষেত্রে যে শায়খুল ইসলাম ইবনে তাইমিয়াকে অনুসরণ করে তিনিও তাকলীদে বিশ্বাস করতেন এবং মানতেনতার ছাত্র ইবনু কাইয়িম আল জাওযিয়্যাহও মাযহাব মানতেনইবনু তাইমিয়ার মাযহাব সম্পর্কে আহলে হাদীসদের অন্যতম আলেম সিদ্দিক হাসান তাঁর আল-জুন্নাহকিতাবের ৩৮ পৃষ্টায় বলেন- শায়খূল ইসলাম ইমাম ইবনু তাইমিয়া হাম্বলী মাযহাবের অনুসারী ছিলেনতার ছাত্র ইবনু কাইয়িমও হাম্বলী মাযহাবের অনুসারী ছিলেন
ইবনু তাইমিয়া এবং ইবনু কাইয়িম আল জাওযিয়্যাহ এর মাযহাব হাম্বলী হওয়ার ব্যাপারে কোন সন্দেহ নাইতাঁর লিখিত মাজমুআতুল ফাতাওয়াএর প্রমাণ বহন করে
প্রশ্ন হলো তাকলীদের ক্ষেত্রে কেন দলীল চাওয়ার প্রয়োজন নেই? সহজ উত্তর- আল্লাহ তাআলা দলীল চাইতে বলেন নি তাই চাওয়া যাবে নাতাকলীদের ব্যাপারে পবিত্র কুরআন শরীফে ইরশাদ হয়েছে- فاسئلوا اهل الذكر إن كنتم لا تعلمون
অর্থ্যা- তোমরা যদি কোন বিষয়ে না জান তাহলে যারা জানে তাদের কাছে জেনে নাও
এই আয়াতে মহান আল্লাহ অজানা বিষয় জানার জন্য বলেছেন, তার জন্য দলীল বা প্রমাণ চাইতে বলেন নিপবিত্র হাদীস শরীফে আমরা উক্ত আয়াতের বাস্তব চিত্র খুজে পাইসাহাবায়ে কিরাম কোন অজানা বিষয়ে যিনি জানেন তাকে প্রশ্ন করলে তিনি যা বলতেন তাই মেনে নিতেনএর জন্য দলীল চাইতেন না
হাদীস শরীফে বর্ণিত আছে হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে উমর (রা.) কে একবার দুই ব্যাক্তির ঋণ সম্পর্কে মাসআলা জিজ্ঞেস করা হলো যে, প্রথমজন দ্বিতীয়জনের কাছে মেয়াদী ঋণের পাওনাদারমেয়াদ পূর্ণ হওয়ার আগে ঋণ পরিশোধ করলে আংশিক ঋণ মওকূফে সম্মত হয়েছেএ ব্যাপারে শরীআতের নির্দেশ কি? হযতে উমর (রা.) তা নাকচ করে দিলেন
হযরত উমর (রা.) নিজ ইজতিহাদ থেকে এই মাসআলা দিয়েছেনসে জন্যে তিনি দলীল পেশ করারও প্রয়োজনবোধ করেননি, এমনকি প্রশ্ন কর্তাও দলীল জানতে চান নি বিনা দলীলে মেনে নিয়েছেনআর বিনা দলীলে মেনে নেওয়ার নামই হলো তাকলীদ
ফারায়যের গুরুত্বপূর্ণ একটি মাসআলা সম্পর্কে হযরত আলী (রা.) কে প্রশ্ন করা হলোতখন তিনি মিম্বরের উপর ছিলেনআলী (রা.) মিম্বরে বসে ফতওয়া দিলেন; তিনি কোন দলীল পেশ করেন নিপ্রশ্নকর্তাও ফতওয়ার পক্ষে কোন দলীল তলব করেননি
মুসনাদে আহমদে বর্ণিত আছে- জনৈক মহিলা সাহাবী রাসূল (সা.)-এর দরবারে এসে আরজ করলেন-ইয়া রাসূল্লাহ! আমার স্বামী জিহাদে গমন করেছেনতিনি থাকাবস্থায় আমি নামাযসহ অন্যান্য আমলের ক্ষেত্রে তাকে অনুসরণ করতামতিনি ফিরে আসা পর্যন্ত আমাকে এমন আমল শিখিয়ে দিন যা তার আমলের স্থলাভিষিক্ত হয়
দেখুন! মহিলা সাহাবী তার যাবতীয় আমলের ক্ষেত্রে তার স্বামীর ইকতিদা করেছেনরাসূল (সা.)ও তা সমর্থন করেছেন
শরীআত সকল মুসলমানদের উপর ফতওয়া প্রদানের দায়িত্ব দেয়নিএকমাত্র কুরআন-হাদীসে পারদর্শীগণ মাসআলা ইস্তিন্ব^াত করবেন, ফতওয়া দিবেনসাধারণ মুসলমান দলীল না চেয়ে তাদের কথা মেনে নিবেনএ সম্পর্কে আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন- فلولا نفر من كل فرقة منهم طائفة ليتفقهوا في الدين ولينذروا قومهم اذا رجعوا اليهم لعلهم يحذرون.
অর্থা- দ্বীনী জ্ঞান শিক্ষার জন্য প্রত্যেক দল থেকে একটি উপদল কেন বেরিয়ে পড়ে না, যেন ফিরে এসে ম্বজাতিকে তারা সতর্ক করতে পারে?
এই আয়াতে মহান আল্লাহ মুসলমানদের কিছু অংশকে দ্বীনী শিক্ষায় পান্ডিত্য অর্জনের কথা বলেছেনযারা শিক্ষা অর্জন করে অবশিষ্ঠ্য মুসলমান; যারা দ্বীনী শিক্ষায় পান্ডিত্য অর্জন করেনি তথা সাধারণ মুসলমানদেরকে নসীহত করবে এবং সাধারণ মুসলমান তাদের কথা মেনে চলবে
মহান আল্লাহ মুসলমানদের সার্বিক সুবিধার জন্যে এই নির্দেশ দিয়েছেনকারণ দ্বীনী বিষয়ে গভীর জ্ঞান অর্জন করা সবার পক্ষে সম্ভব নয়পক্ষান্তরে আহলে হাদীসরা মহান আল্লাহর এই সহজ বিধানকে কঠিন থেকে কঠিনতর করার জন্যে বলে যে সকল মুসলমানের জন্য কুরআন-হাদীসের জ্ঞান অর্জন করতে হবে
ইসলামের সকল যুগেই দুধরনের মুসলমান ছিলেনআম এবং খাসমুসলমানদের এক অংশ দ্বীনী বিষয়ে অগাধ জ্ঞান রাখতেন, ইজতিহাদ করতেন এবং সে অনুযায়ী ফতওয়া দিতেনআর অপর পক্ষ তাদের কথা মেনে নিয়ে আমল করতেনযেমন
হযরত আব্দুর রহমান ইবনু আউফ (রা.) বিশেষ একপ্রকার মোজা পরতে দেখে উমর (রা.) বলেছিলেন- তোমাকে কসম দিয়ে বলছি তুমি মোজা জোড়া খুলে ফেলকারণ আমি আশঙ্কা করি সাধারণ লোকজন তোমাকে দেখে তোমার ইকতিদা করবে
হযতে তালহা (রা.) এর গায়ে রঙ্গিন ইহরাম দেখে হযরত উমর (রা.) বললেন এটা কেন পড়েছে? তালহা (রা.) বললেন এটাতে তো সুগন্ধি নাইউমর (রা.) বললেন- শুন! তোমরা হলে ইমামসাধারণ লোকজন তোমাদের ইকতদা করেকোন অজ্ঞ লোক তোমার এই কাপড় দেখলে বলবে তালহা ইবনু উবায়দুল্লাহ ইহােম হিসাবে রঙ্গিন কাপড় পড়তেন (না বুঝে সুগন্ধযুক্ত এবং সুগন্ধহীন উভয় কাপড় পড়া শুরু করবে)সুতরায় তোমরা এমন কাপড় পড়ো না
ইসলামের প্রতিটি যুগে সাধারণ মুসলমানদের বিরাট একটি অংশ ছিলযারা উলামায়ে কেরামের কথা, উক্তি এবং তাদের দেখানো আমল আদর্শ হিসাবে মানতেন এবং তাকলীদ বা অনুসরণ করতেনকারণ তারা বিশ্বাস করতেন উলামায়ে কিরাম যে ফতওয়া বা আদর্শ আমাদেরকে দিচ্ছেন সেটা অবশ্যই কুরআন এবং হাদীস গবেষণা করেই দিচ্ছেনএই গবেষনার নাম হচ্ছে ইজতিহাদ
আহলে হাদীসরা মুসলমানদেরকে তাদের পূর্বসুরীদের পথ এবং মত থেকে সরিয়ে দাজ্জালী ফিতনার মুখোমুখি করার প্রয়াস চালাচ্ছেতারা সরলমনা মুসলমানদের ধোকা দেওয়ার জন্য বলে পূর্বসুরীদের পথ আকড়ে ধরা হলো কাফিরদের স্বভাবঅথচ কুরআন শরীফে আল্লাহ তালা মুনাফিকদের বৈশিষ্ঠ সম্পর্কে বলেন আর তারা মুমিনদের (রেখে যাওয়া) পথ ছেড়ে অন্য পথের অনুসরণ করে
লা-মাযহাবীরা মুখে যতই বলুক যে তারা তাকলীদ করে না কিন্তু বাস্তবে তাদের প্রতিটি কাজ-কর্মই তাকলীদ অনুযায়ী হচ্ছেযেমন, আমরা জানি কুরআন শরীফ সাত কিরাআতে নাযিল হয়েছে বর্তমানে সারা পৃথিবীতেই ইমাম হাফস (র.)-এর কিরাত প্রচলিত আছেবিশ্বের সকল মুসলমান এ ক্ষেত্রে ইমাম হাফস (র.)-এর তাকলীদ করেনআহলে হাদীস, লা-মাযহাবী, সালাফীরাও ইমাম হাফসের কিরাআতে পবিত্র কুরআন তিলাওয়াত করেন; এত তারা ইমাম হাফস (র.)-এর তাকলীদ করল

আহলে হাদীসের প্রতি কিছু প্রশ্ন
আহলে হাদীসরা মাযহাব পন্থী লোকদের ধোকা দেওয়ার জন্য দসব সময় বলে থাকেন কুরআন এবং সহীহ হাদীসে আছে কি না? সে জন্যে নিচে কিছু প্রশ্ন দেওয়া হলো, আহলে হাদীস ভাইগণ উত্তর দিবেন
নামাযসহ শরীআতের বিভিন্ন হুকুম-আহকামে যে সমস্ত ফরয, ওয়াজিব, সুন্নত এবং মুস্তাহাব ইত্যাদি পরিভাষা ব্যবহার করা হয়েছে, কুরআন এবং সহীহ হাদীসের আলোকে সেগুলো প্রমাণ করুন
হাদীস শরীফে মানুষের ছবির ব্যাপারে কঠোরভাবে নিষেধাজ্ঞা এসেছেতারপরও আহলে হাদীস ভাইয়েরা টি.ভি তে অনুষ্ঠান করেন কোন আয়াত এবং সহীহ হাদীসের আলোকে?
পবিত্র হাদীস অনুযায়ী ছবি তোলা হারামতাহলে হজ্জের জন্য ছবি তুলা বৈধ হওয়ার ব্যাপারে কুরআন এবং সহীহ হাদীস থেকে প্রমাণ পেশ করুন
পবিত্র কুরআন তেলাওয়াতের ক্ষেত্রে রাসূল (সা.) কোন কিরাত পড়তেন? ইমাম হাফস (র.)-এর কিরাত রাসূল (সা.)-এর কিরাত কি না? সহীহ হাদীসের আলোকে প্রমাণ করুনযদি না হয় তাহলে আপনারা রাসূল (সা.) এর কিরাতে পড়েন না কেন?
মোবাইলে বা রেকর্ডে সিজদার আয়াত তিলাওয়াত করলে সিজদা ওয়াজিব হবে কি না? কুরআন এবং সহীহ হাদীস দ্বারা প্রমাণ পেশ করুন

রাসূল (সা.)-এর যুগে হাদীস সংকলিত হয়েছিল কি না? সহীহ হাদীস দ্বারা প্রমাণ দিন

মঙ্গলবার, ৩ মার্চ, ২০১৫

আল কুরআন : দ্যা চ্যালেঞ্জার


মোহাম্মদ নজমুল হুদা খান
মোহাম্মদ নজমুল হুদা খান
আশরাফুল মাখলুকাত হিসেবে মানব জাতিকে সৃষ্টি করে তাদের সঠিক পথ প্রদর্শনের জন্য আল্লাহ পাক যুগে যুগে নবী-রাসূল প্রেরণ করেছেন। আর যুগের চাহিদা অনুসারে তাঁদেরকে দিয়েছেন আসমানীগ্রন্থ। স্বভাবতই সর্বশেষ ও সর্বশ্রেষ্ঠ নবী হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর উপর নাযিল হয়েছে সর্বশ্রেষ্ঠ গ্রন্থ আল কুরআন। বিষয় বৈচিত্র, স্বকীয়তা, অনুপম রচনাশৈলী, প্রকাশ ভঙ্গির স্বাতন্ত্র্য, সহজ ও সুন্দর ও সাবলীল বাক্য বিন্যাস, অকাট্য যুক্তি প্রমাণ উপস্থাপন ইত্যাদি দিক বিবেচনায় আল কুরআন সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ সন্দেহাতীত গ্রন্থ হিসেবে স্বীকৃত।
মহাগ্রন্থ আল কুরআনের আয়াতসমূহ সুদীর্ঘ তেইশ বছরে বিশেষ বিশেষ উপলক্ষকে কেন্দ্র করেই মহানবী (সা.)-এর উপর অবতীর্ণ হয়েছে। এতে বিভিন্ন জিজ্ঞাসার জবাব ও সমস্যার সমাধান দেয়া হয়েছে, নানাবিধ সন্দেহের অপনোদন করা হয়েছে। এসব বিষয়ে বিভিন্ন ক্ষেত্রে অকাট্য যুক্তি-প্রমাণ উপস্থাপন করা হয়েছে। পাশাপাশি এসব যুক্তি প্রমাণ খন্ডন করার জন্য খোদাদ্রোহীদের প্রতি চ্যালেঞ্জ করা হয়েছে। বিশেষতঃ আল কুরআন আল্লাহর পক্ষ থেকে অবতারিত কি না? এটি সত্য সত্যই আসমানী গ্রন্থ কি না? ইত্যকার বিষয়ে যারা সন্দেহ পোষণ করেছে, আল্লাহ তাদের প্রতি চ্যালেঞ্জ ছুঁড়েছেন। আল্লামা জালাল উদ্দিন সুয়ূতী (র.)-এর ‘আল ইতক্বান’ এর ভাষ্য মতে প্রথমতঃ তাদেরকে সমস্ত কুরআন মজিদের অনুরূপ গ্রন্থ রচনার ক্ষেত্রে চ্যালেঞ্জ করা হয়েছে। আল্লাহ তা‘আলা ইরশাদ করেন-
فَلْيَأْتُوا بِحَدِيثٍ مِثْلِهِ إِنْ كَانُوا صَادِقِينَ -
“যদি তারা দাবীতে সত্যবাদী হয় তবে যেন কুরআনের অনুরূপ একটি গ্রন্থ রচনা করে নিয়ে  আসে” (সূরা তূর, আয়াত-৩৪)।
এ চ্যালেঞ্জের পর আল্লাহ তা‘আলা তাদেরকে কয়েক বছর সময় দেন, কিন্তু তারা কুরআনের সমকক্ষ কিছু রচনা করতে সক্ষম হয় নি। এরপর তাদেরকে কুরআন মজীদের অনুরূপ দশটি সূরা রচনার চ্যালেঞ্জ করা হয়। এ চ্যালেঞ্জ স্বরূপ আল্লাহ তা‘আলা ঘোষণা করেন ঃ-
أَمْ يَقُولُونَ افْتَرَاهُ قُلْ فَأْتُوا بِعَشْرِ سُوَرٍ مِثْلِهِ مُفْتَرَيَاتٍ وَادْعُوا مَنِ اسْتَطَعْتُمْ مِنْ دُونِ اللَّهِ إِنْ كُنْتُمْ صَادِقِينَ -
“তারা কি বলে তিনি [মুহাম্মদ সা.] এ কিতাব রচনা করেছেন? হে মুহাম্মদ (সা.)! আপনি বলে দিন, যদি তোমরা তোমাদের দাবীতে সত্যবাদী হও তবে তোমরা এর অনুরূপ দশটি সূরা রচনা কর এবং আল্লাহ ছাড়া যাকে পার ডেকে নাও” (সূরা হুদ-১৩)।
অতঃপর কুরআনের অনুরূপ কেবল একটি সূরা রচনার চ্যালেঞ্জ করে আল্লাহ তা‘আলা ইরশাদ করেন ঃ-
أَمْ يَقُولُونَ افْتَرَاهُ قُلْ فَأْتُوا بِسُورَةٍ مِثْلِهِ وَادْعُوا مَنِ اسْتَطَعْتُمْ مِنْ دُونِ اللَّهِ إِنْ كُنْتُمْ صَادِقِينَ -
“তারা কি বলে তিনি [মুহাম্মদ সা.] এ কিতাব রচনা করেছেন? হে মুহাম্মদ (সা.)! আপনি বলে দিন, যদি তোমরা তোমাদের দাবীতে সত্যবাদী হও, তবে তোমরা এর অনুরূপ একটি সূরা রচনা কর এবং আল্লাহ ছাড়া যাকে পার ডেকে নাও’ (সূরা ইউনুস-৩৮)।
এ পর্যায়ে আল্লাহ আবারও ঘোষণা দেন ঃ
وَإِنْ كُنْتُمْ فِي رَيْبٍ مِمَّا نَزَّلْنَا عَلَى عَبْدِنَا فَأْتُوا بِسُورَةٍ مِنْ مِثْلِهِ وَادْعُوا شُهَدَاءَكُمْ مِنْ دُونِ اللَّهِ إِنْ كُنْتُمْ صَادِقِينَ - فَإِنْ لَمْ تَفْعَلُوا وَلَنْ تَفْعَلُوا فَاتَّقُوا النَّارَ الَّتِي وَقُودُهَا النَّاسُ وَالْحِجَارَةُ أُعِدَّتْ لِلْكَافِرِينَ -
“আমি আমার বান্দার উপর যা নাযিল করেছি তাতে যদি তোমরা সন্দেহ কর, তবে তোমরা এর অনুরূপ একটি সূরা রচনা কর এবং আল্লাহ ছাড়া তোমাদের অন্য সাহায্যকারীদের ডেকে নাও” (সূরা বাক্বারা-২৩-২৪)।
মক্কার কাফিরগোষ্ঠী সে চ্যালেঞ্জের মুকাবিলায় অক্ষম হয়ে পড়ে। যে কাফির কবি-সাহিত্যিক গোষ্ঠী মন মাতানো ছন্দ-ঝংকারে সারা আরব জাহান মোহিত ও প্রভাবান্বিত করে রাখত তারা পবিত্র কুরআনের একটি সূরারও মুকাবিলা তো দূরের কথা, বরং এর প্রভাবে প্রভাবিত হয়ে ইসলাম গ্রহণ করতে শুরু করে। আরবের খ্যাতনামা কবি ওয়ালিদ ইবনে মুগীরা এতই দাম্ভিক ছিল যে, সে অন্য কাউকে নিজের সমকক্ষ মনে করত না। কুরায়শগণ তাকে অঢেল ধন-সম্পদ ও সম্মানের লোভ দেখিয়ে কুরআনের মত একটি আয়াত রচনা করতে পীড়াপীড়ি শুরু করল। সে বলল, হে কুরায়শগণ! তোমরা তাকে যাদুকর বলছ, আমি আল্লাহর শপথ করে বলছি, তিনি যাদুকর নন। আমি যাদুর তন্ত্রমন্ত্র দেখেছি। তোমরা তাঁকে পাগল বলছ, আল্লাহর শপথ! তিনি পাগল নন, আমি পাগল ও তাদের কার্যকলাপ দেখেছি। হে কুরায়শগণ, তোমরা নিজেদের অবস্থা চিন্তা কর। আল্লাহর শপথ! পবিত্র কুরআন নিশ্চয় অমূল্য সম্পদ এবং তা আমাদের জন্য নাযিল করা হয়েছে।
লবিদ ইবনে রবীয়া ছিলেন তৎকালীন আরব কবিদের শিরমণি। কবিতা রচনায় অসাধারণ দক্ষ বলে তিনি অপরাপর সাহিত্যিকদের ঘৃণার চোখে দেখতেন। কিন্তু কুরআনের আয়াতের মুকাবিলায় তিনিও অক্ষম হয়ে পড়েন। যখন কুরআন মজীদের একটি সূরা কা’বা ঘরে টাঙ্গানো হলো, তখন তিনি এটি পড়ে অত্যন্ত লজ্জিত হলেন। একই সাথে তার মনে হলো এটি কোন মানব রচিত পংক্তি নয়, বরং ইহা  আল্লাহর কালাম। তাই তিনি অকপটে ঘোষণা করলেন, ليس هذا من كلام البشر পরিশেষে তিনি ইসলামের সুশীতল ছায়াতলে আশ্রয় নিলেন।
এমনিভাবে ওলীদ ইবনে মুগীরা, লবিদ ইবনে রবিয়ার মত অন্য সকল আরব কবি আল কুরআনের চ্যালেঞ্জ-এর কাছে নতি স্বীকার করেছে, এর মুকাবিলায় তারা অক্ষম হয়েছে। পক্ষান্তরে স্বকীয়তা ও সত্যতার চ্যালেঞ্জার হিসেবে আল কুরআন আপন মহিমায় শ্রেষ্ঠত্ব ও বিজয়ের আসনে সমাসীন থেকেছে। স্বয়ং আল্লাহ রাব্বুল আলামীন ঘোষণা করেন-
قُلْ لَئِنِ اجْتَمَعَتِ الْإِنْسُ وَالْجِنُّ عَلَى أَنْ يَأْتُوا بِمِثْلِ هَذَا الْقُرْآنِ لَا يَأْتُونَ بِمِثْلِهِ وَلَوْ كَانَ بَعْضُهُمْ لِبَعْضٍ ظَهِيرًا -
- [হে মুহাম্মদ (সা.)!] আপনি বলে দিন, যদি কুরআন অনুরূপ রচনা করার জন্য মানুষ ও জিন জাতি সমবেত হয় এবং তারা পরস্পরকে সাহায্য করে তবুও তারা এর অনুরূপ রচনা করতে পারবে না (বনী ইসরাঈল, আয়াত-৮৮)।
আল কুরআনুল কারীম মহান আল্লাহর বাণী। এটি চিরন্তন ও চিরশাশ্বত। কোন কালে কাফির-মুশরিকগোষ্ঠী এর মুকাবিলা করতে পারে নি এবং কিয়ামত পর্যন্ত কখনো পারবে না। চিরকাল অপ্রতিদ্বন্দ্বী মহাগ্রন্থ হিসেবে এটি টিকে থাকবে।

আল কুরআন : দ্যা চ্যালেঞ্জার


 মোহাম্মদ নজমুল হুদা খান

আশরাফুল মাখলুকাত হিসেবে মানব জাতিকে সৃষ্টি করে তাদের সঠিক পথ প্রদর্শনের জন্য আল্লাহ পাক যুগে যুগে নবী-রাসূল প্রেরণ করেছেন। আর যুগের চাহিদা অনুসারে তাঁদেরকে দিয়েছেন আসমানীগ্রন্থ। স্বভাবতই সর্বশেষ ও সর্বশ্রেষ্ঠ নবী হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর উপর নাযিল হয়েছে সর্বশ্রেষ্ঠ গ্রন্থ আল কুরআন। বিষয় বৈচিত্র, স্বকীয়তা, অনুপম রচনাশৈলী, প্রকাশ ভঙ্গির স্বাতন্ত্র্য, সহজ ও সুন্দর ও সাবলীল বাক্য বিন্যাস, অকাট্য যুক্তি প্রমাণ উপস্থাপন ইত্যাদি দিক বিবেচনায় আল কুরআন সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ সন্দেহাতীত গ্রন্থ হিসেবে স্বীকৃত।
মহাগ্রন্থ আল কুরআনের আয়াতসমূহ সুদীর্ঘ তেইশ বছরে বিশেষ বিশেষ উপলক্ষকে কেন্দ্র করেই মহানবী (সা.)-এর উপর অবতীর্ণ হয়েছে। এতে বিভিন্ন জিজ্ঞাসার জবাব ও সমস্যার সমাধান দেয়া হয়েছে, নানাবিধ সন্দেহের অপনোদন করা হয়েছে। এসব বিষয়ে বিভিন্ন ক্ষেত্রে অকাট্য যুক্তি-প্রমাণ উপস্থাপন করা হয়েছে। পাশাপাশি এসব যুক্তি প্রমাণ খন্ডন করার জন্য খোদাদ্রোহীদের প্রতি চ্যালেঞ্জ করা হয়েছে। বিশেষতঃ আল কুরআন আল্লাহর পক্ষ থেকে অবতারিত কি না? এটি সত্য সত্যই আসমানী গ্রন্থ কি না? ইত্যকার বিষয়ে যারা সন্দেহ পোষণ করেছে, আল্লাহ তাদের প্রতি চ্যালেঞ্জ ছুঁড়েছেন। আল্লামা জালাল উদ্দিন সুয়ূতী (র.)-এর ‘আল ইতক্বান’ এর ভাষ্য মতে প্রথমতঃ তাদেরকে সমস্ত কুরআন মজিদের অনুরূপ গ্রন্থ রচনার ক্ষেত্রে চ্যালেঞ্জ করা হয়েছে। আল্লাহ তা‘আলা ইরশাদ করেন-
فَلْيَأْتُوا بِحَدِيثٍ مِثْلِهِ إِنْ كَانُوا صَادِقِينَ -
“যদি তারা দাবীতে সত্যবাদী হয় তবে যেন কুরআনের অনুরূপ একটি গ্রন্থ রচনা করে নিয়ে  আসে” (সূরা তূর, আয়াত-৩৪)।
এ চ্যালেঞ্জের পর আল্লাহ তা‘আলা তাদেরকে কয়েক বছর সময় দেন, কিন্তু তারা কুরআনের সমকক্ষ কিছু রচনা করতে সক্ষম হয় নি। এরপর তাদেরকে কুরআন মজীদের অনুরূপ দশটি সূরা রচনার চ্যালেঞ্জ করা হয়। এ চ্যালেঞ্জ স্বরূপ আল্লাহ তা‘আলা ঘোষণা করেন ঃ-
أَمْ يَقُولُونَ افْتَرَاهُ قُلْ فَأْتُوا بِعَشْرِ سُوَرٍ مِثْلِهِ مُفْتَرَيَاتٍ وَادْعُوا مَنِ اسْتَطَعْتُمْ مِنْ دُونِ اللَّهِ إِنْ كُنْتُمْ صَادِقِينَ -
“তারা কি বলে তিনি [মুহাম্মদ সা.] এ কিতাব রচনা করেছেন? হে মুহাম্মদ (সা.)! আপনি বলে দিন, যদি তোমরা তোমাদের দাবীতে সত্যবাদী হও তবে তোমরা এর অনুরূপ দশটি সূরা রচনা কর এবং আল্লাহ ছাড়া যাকে পার ডেকে নাও” (সূরা হুদ-১৩)।
অতঃপর কুরআনের অনুরূপ কেবল একটি সূরা রচনার চ্যালেঞ্জ করে আল্লাহ তা‘আলা ইরশাদ করেন ঃ-
أَمْ يَقُولُونَ افْتَرَاهُ قُلْ فَأْتُوا بِسُورَةٍ مِثْلِهِ وَادْعُوا مَنِ اسْتَطَعْتُمْ مِنْ دُونِ اللَّهِ إِنْ كُنْتُمْ صَادِقِينَ -
“তারা কি বলে তিনি [মুহাম্মদ সা.] এ কিতাব রচনা করেছেন? হে মুহাম্মদ (সা.)! আপনি বলে দিন, যদি তোমরা তোমাদের দাবীতে সত্যবাদী হও, তবে তোমরা এর অনুরূপ একটি সূরা রচনা কর এবং আল্লাহ ছাড়া যাকে পার ডেকে নাও’ (সূরা ইউনুস-৩৮)।
এ পর্যায়ে আল্লাহ আবারও ঘোষণা দেন ঃ
وَإِنْ كُنْتُمْ فِي رَيْبٍ مِمَّا نَزَّلْنَا عَلَى عَبْدِنَا فَأْتُوا بِسُورَةٍ مِنْ مِثْلِهِ وَادْعُوا شُهَدَاءَكُمْ مِنْ دُونِ اللَّهِ إِنْ كُنْتُمْ صَادِقِينَ - فَإِنْ لَمْ تَفْعَلُوا وَلَنْ تَفْعَلُوا فَاتَّقُوا النَّارَ الَّتِي وَقُودُهَا النَّاسُ وَالْحِجَارَةُ أُعِدَّتْ لِلْكَافِرِينَ -
“আমি আমার বান্দার উপর যা নাযিল করেছি তাতে যদি তোমরা সন্দেহ কর, তবে তোমরা এর অনুরূপ একটি সূরা রচনা কর এবং আল্লাহ ছাড়া তোমাদের অন্য সাহায্যকারীদের ডেকে নাও” (সূরা বাক্বারা-২৩-২৪)।
মক্কার কাফিরগোষ্ঠী সে চ্যালেঞ্জের মুকাবিলায় অক্ষম হয়ে পড়ে। যে কাফির কবি-সাহিত্যিক গোষ্ঠী মন মাতানো ছন্দ-ঝংকারে সারা আরব জাহান মোহিত ও প্রভাবান্বিত করে রাখত তারা পবিত্র কুরআনের একটি সূরারও মুকাবিলা তো দূরের কথা, বরং এর প্রভাবে প্রভাবিত হয়ে ইসলাম গ্রহণ করতে শুরু করে। আরবের খ্যাতনামা কবি ওয়ালিদ ইবনে মুগীরা এতই দাম্ভিক ছিল যে, সে অন্য কাউকে নিজের সমকক্ষ মনে করত না। কুরায়শগণ তাকে অঢেল ধন-সম্পদ ও সম্মানের লোভ দেখিয়ে কুরআনের মত একটি আয়াত রচনা করতে পীড়াপীড়ি শুরু করল। সে বলল, হে কুরায়শগণ! তোমরা তাকে যাদুকর বলছ, আমি আল্লাহর শপথ করে বলছি, তিনি যাদুকর নন। আমি যাদুর তন্ত্রমন্ত্র দেখেছি। তোমরা তাঁকে পাগল বলছ, আল্লাহর শপথ! তিনি পাগল নন, আমি পাগল ও তাদের কার্যকলাপ দেখেছি। হে কুরায়শগণ, তোমরা নিজেদের অবস্থা চিন্তা কর। আল্লাহর শপথ! পবিত্র কুরআন নিশ্চয় অমূল্য সম্পদ এবং তা আমাদের জন্য নাযিল করা হয়েছে।
লবিদ ইবনে রবীয়া ছিলেন তৎকালীন আরব কবিদের শিরমণি। কবিতা রচনায় অসাধারণ দক্ষ বলে তিনি অপরাপর সাহিত্যিকদের ঘৃণার চোখে দেখতেন। কিন্তু কুরআনের আয়াতের মুকাবিলায় তিনিও অক্ষম হয়ে পড়েন। যখন কুরআন মজীদের একটি সূরা কা’বা ঘরে টাঙ্গানো হলো, তখন তিনি এটি পড়ে অত্যন্ত লজ্জিত হলেন। একই সাথে তার মনে হলো এটি কোন মানব রচিত পংক্তি নয়, বরং ইহা  আল্লাহর কালাম। তাই তিনি অকপটে ঘোষণা করলেন, ليس هذا من كلام البشر পরিশেষে তিনি ইসলামের সুশীতল ছায়াতলে আশ্রয় নিলেন।
এমনিভাবে ওলীদ ইবনে মুগীরা, লবিদ ইবনে রবিয়ার মত অন্য সকল আরব কবি আল কুরআনের চ্যালেঞ্জ-এর কাছে নতি স্বীকার করেছে, এর মুকাবিলায় তারা অক্ষম হয়েছে। পক্ষান্তরে স্বকীয়তা ও সত্যতার চ্যালেঞ্জার হিসেবে আল কুরআন আপন মহিমায় শ্রেষ্ঠত্ব ও বিজয়ের আসনে সমাসীন থেকেছে। স্বয়ং আল্লাহ রাব্বুল আলামীন ঘোষণা করেন-
قُلْ لَئِنِ اجْتَمَعَتِ الْإِنْسُ وَالْجِنُّ عَلَى أَنْ يَأْتُوا بِمِثْلِ هَذَا الْقُرْآنِ لَا يَأْتُونَ بِمِثْلِهِ وَلَوْ كَانَ بَعْضُهُمْ لِبَعْضٍ ظَهِيرًا -
- [হে মুহাম্মদ (সা.)!] আপনি বলে দিন, যদি কুরআন অনুরূপ রচনা করার জন্য মানুষ ও জিন জাতি সমবেত হয় এবং তারা পরস্পরকে সাহায্য করে তবুও তারা এর অনুরূপ রচনা করতে পারবে না (বনী ইসরাঈল, আয়াত-৮৮)।
আল কুরআনুল কারীম মহান আল্লাহর বাণী। এটি চিরন্তন ও চিরশাশ্বত। কোন কালে কাফির-মুশরিকগোষ্ঠী এর মুকাবিলা করতে পারে নি এবং কিয়ামত পর্যন্ত কখনো পারবে না। চিরকাল অপ্রতিদ্বন্দ্বী মহাগ্রন্থ হিসেবে এটি টিকে থাকবে।

সোমবার, ২ মার্চ, ২০১৫

প্রসঙ্গ : আউলিয়ায়ে কিরাম

মূল : হযরত আল্লামা ওয়াজিহ উদ্দীন রামপুরী (র.)
অনুবাদ : মোহাম্মদ নজমুল হুদা খান

ওলীর পরিচয়
‘আউলিয়া’ শব্দটি ‘ওলী’ শব্দের বহুবচন। ওলী ঐ মুমিন ব্যক্তিকে বলা হয় যিনি কবীরাহ গুনাহ থেকে বেঁচে থাকেন এবং আহকামে এলাহী তথা খোদায়ী বিধি-বিধানকে যথাসাধ্য মেনে চলেন, দুনিয়ার ভোগ-বিলাসে মত্ত হন না। অধিক ইবাদত ও রিয়াযতের ফলে তাঁর মধ্যে রূহানী লাতাফাত সৃষ্টি হয়। ফলে তাঁর ‘রু’য়া সালিহা’ বা উত্তম স্বপ্নের মতো সম্পদ হাসিল হয় অথবা তাঁর বিষয়ে অন্যরা উত্তম স্বপ্ন দেখেন। তাঁর সাহচর্য-সান্নিধ্য মানুষকে আল্লাহর স্মরণে নিবিষ্ট করে দেয়।

মরতবায়ে সিদ্দীকিয়াত
(ওলায়তের একটি স্তরে) ওলীর রূহ বা আত্মা নবীর রূহের সাথে এ পরিমাণ সম্পর্কিত হয় যে, এ স্তরে একজন ওলীর রূহ এমন সব বিষয় চিন্তা ভাবনা ছাড়াই তাৎক্ষণিকভাবে মেনে নেয় যা মূলত নবীর সত্তার জ্ঞান। এ স্তর ওলায়তের সকল স্তরের চেয়ে উত্তম ও সর্বোন্নত। এ স্তরের ওলীকে শরীআতের পরিভাষায় ‘সিদ্দীক’ বলা হয়। উম্মতে মুহাম্মদীর মধ্যে অনেক সিদ্দীক অতিবাহিত হয়েছেন। তাঁদের মধ্যে সর্বোত্তম ও সবচেয়ে মর্যাবান হলেন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর প্রথম খলীফা হযরত আবূ বকর সিদ্দীক (রা.)। এ কারণে তাঁকে ‘সিদ্দীকে আকবর’ বলা হয়।
[নবীর কথা শুনার পর এ স্তরের ওলীর অন্তরে সংশ্লিষ্ট বিষয়ে কোনো ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ ও আকলী দলীল-প্রমাণ তলবের খেয়ালও আসে না। যেমন, যখন নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আবূ বকর (রা.)-এর সামনে ইসলামের কথা পেশ করলেন এবং বললেন : হে আবূ বকর, আমি আল্লাহর নবী ও রাসূল, তখন সিদ্দীকে আকবর (রা.) কোনো চিন্তা ছাড়াই তৎক্ষণাৎ তাঁকে আল্লাহর পক্ষ থেকে সত্য নবী ও শেষ যামানার রাসূল হিসেবে স্বীকার করে নিলেন এবং কলিমায়ে তায়্যিবা পড়ে ইসলামের মধ্যে দাখিল হয়ে ‘সিদ্দীকে আকবর’ উপাধিতে ভূষিত হলেন। এ কারণেই হযরত আবূ বকর (রা.) ‘নবীগণের পর সর্বোত্তম মানুষ’। এছাড়াও আরো বহু কারণ রয়েছে যার ভিত্তিতে আবূ বকর (রা.) ‘সিদ্দীকে আকবর’ হিসেবে স্বীকৃতি লাভ করেছেন।]
আল্লাহ তাআলার পক্ষ থেকে কিছু নারীকেও এ মর্যাদা প্রদত্ত হয়েছে। কুরআনে আযীমে হযরত ঈসা আলাইহিস সালাম-এর সম্মানিত মাতা হযরত মরিয়ম আলাইহাস সালাম প্রসঙ্গে আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন : وامه صديقة ‘আর তাঁর (ঈসা আলাইহিস সালাম-এর) মা হলেন সিদ্দীকা।’

রুতবায়ে শাহাদত
সিদ্দীকিয়াতের নি¤œস্তর হলো রুতবায়ে শাহাদত। সুপ্রসিদ্ধ সংজ্ঞা মতে, শহীদ ঐ ব্যক্তি যিনি এ’লায়ে কালিমাতিল্লাহ তথা আল্লাহর কলিমাকে সুপ্রতিষ্ঠিত করার জন্য জীবন দান করেন। সাহাবায়ে কিরাম (রা.) রাসূলে আকরাম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-কে বললেন, ‘ইয়া রাসূলাল্লাহ (সা.), কোনো ব্যক্তি সম্পদের জন্য লড়াই করে আবার কোনো ব্যক্তি মান-সম্মানের জন্য লড়াই করে, এদের মধ্যে আল্লাহর রাস্তায় কর্মসম্পাদনকারী কোন্ ব্যক্তি ?’ সরওয়ারে কায়িনাত সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করলেন :
من قاتل لتكون كلمة الله هي العليا فهو في سبيل الله
-‘যে ব্যক্তি এই উদ্দেশ্যে জিহাদ করে যে আল্লাহর কলিমা বুলন্দ হবে সে ব্যক্তি আল্লাহর আল্লাহর রাস্তায় লড়াইকারী।’
অন্য হাদীসে আছে, সায়্যিদুল আম্বিয়া সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সাহাবায়ে কিরামকে বললেন, ‘হে সাহাবীগণ, তোমরা শহীদ বলতে কাকে বুঝ ?’ সাহাবায়ে কিরাম বললেন, ‘ইয়া রাসূলাল্লাহ (সা.) , যারা যুদ্ধে মারা যায়।’ আরব ও আজমের সরদার নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ফরমালেন, এ হিসেবে তো আমার উম্মতের সংখ্যা কম হয়ে যাবে, যাদের শহীদ বলা যাবে।
‘বরং যে অগ্নিদগ্ধ হয়ে মারা যাবে সে শহীদ, কোনো কিছুতে পিষ্ট হয়ে মারা গেলে শহীদ, পানিতে ডুবে মৃত্যুবরণ করলেও শহীদ, তাউন তথা প্লেগরোগে মারা গেলেও শহীদ, কলেরায় আক্রান্ত হয়ে মারা গেলেও শহীদ, সন্তান প্রসবের সময় মৃত্যুবরণকারী মহিলাও শহীদ, নিউমোনিয়া রোগে মারা গেলেও শহীদ।’
অন্যত্র তিনি ইরশাদ করেন, ‘যে নিজের দীন রক্ষার জন্য মৃত্যুবরণ করে সে শহীদ, যে সম্মান-সম্ভ্রম রক্ষার জন্য মারা যায় সে শহীদ, যে আপন জীবন রক্ষার জন্য মারা যায় সে শহীদ।’
একদা হযূর রাহমাতুল্লিল আলামীন সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ওহুদ পাহাড়ের উপর আরোহন করেছিলেন আর তাঁর সাথে হযরত সিদ্দীকে আকবর, ফারূকে আ’যম ও ওসমান যিন্নুরাইন (রা.) ছিলেন। এ সময় পাহাড়ে কম্পন শুরু হলে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ওহুদ পাহাড়ের উপর পদাঘাত করলেন আর বললেন : ‘ওহুদ, তুমি স্থির ও শান্ত থাকো, তোমার উপর এক নবী, এক সিদ্দীক ও দুই শহীদ রয়েছেন।’
এখানে নবী দ্বারা হুযূর নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর নূরানী সত্তা উদ্দেশ্য, সিদ্দীক দ্বারা হযরত আবূ বকর সিদ্দীক (রা.) উদ্দেশ্য। আর দুই শহীদ দ্বারা হযরত ফারূকে আ’যম ওমর ইবনুল খাত্তাব ও হযরত ওসমান যিন্নুরাইন (রা.) উদ্দেশ্য। অথচ তখনো তাঁরা শহীদ হননি।
এ সকল হাদীসে মুবারাকার প্রতি লক্ষ্য রেখে হযরত শাহ আব্দুল আযীয মুহাদ্দিসে দেহলভী (র.)  তদীয় তাফসীর ‘ফতহুল আযীয’-এর মধ্যে লিখেছেন, শহীদ ঐ মুমিন ব্যক্তি যে সর্বদা তার শির হাতের তালুতে নিয়ে চলাফেরা করে এবং আল্লাহর সন্তুষ্টির লক্ষে জীবন বিলিয়ে দিতে কোনো দ্বিধা করে না।
وبال دوش ہے اس ناتواں پہ سر لیکن
لگا رکھا ترے حنجروسنان کے لئے
এ মরতবা উক্ত ব্যক্তিরই অর্জিত হয় যে আপন দৃষ্টিতে দুনিয়াকে তুচ্ছ এবং আখিরাতকে অবশ্যম্ভাবী মনে করতে পেরেছে। আল্লাহর সন্তুষ্টির মুকাবিলায় সে নিজের জান, মাল, সন্তান-সন্ততি, আত্মীয়-স্বজনের কোনো প্রয়োজন উপলব্ধি করে না। সাধারণত সাহাবায়ে ইযাম (রা.) এবং আল্লাহর বিশেষ ও নৈকট্যপ্রাপ্ত বান্দাগণের এ অবস্থা ছিল।
دولت وشوکت وثروت سے گذر جاتے تھے
وقت جب آتاتھا اسلام پہ مر جاتے تھے

সারকথা, শহীদগণের পবিত্র রূহ সিদ্দীকগণের রূহের নিকটবর্তী। কিন্তু রূহে নবুওয়াতের সাথে তার সেরূপ সম্পর্ক লাভ হয় না, যেরূপ সিদ্দীকের হয়ে থাকে।

মরতবায়ে সালিহিয়্যাত
শাহাদতের নিচের স্তর হলো মরতবায়ে সালিহিয়্যাত। সালিহ বা সৎকর্মশীল হলেন ঐ বুযুর্গ, যিনি আহকামে এলাহী তথা খোদায়ী বিধি-বিধানের পাবন্দী করেন, কবীরা গুনাহ থেকে বেঁচে থাকেন কিন্তু তাঁর রূহের ঐ স্তর হাসিল হয় না যা সিদ্দীক ও শহীদের হাসিল হয়। উলামায়ে কিরাম ও সূফীয়ায়ে ইযাম ওলীদের এ স্তরবিন্যাস কুরআনে আযীমের নি¤েœাক্ত আয়াত থেকে নিয়েছেন। আয়াতটি হলো :
وَمَنْ يُطِعِ اللهَ وَالرَّسُولَ فَأُولَئِكَ مَعَ الَّذِينَ أَنْعَمَ اللهُ عَلَيْهِمْ مِنَ النَّبِيِّينَ وَالصِّدِّيقِينَ وَالشُّهَدَاءِ وَالصَّالِحِينَ وَحَسُنَ أُولَئِكَ رَفِيقًا-
-‘যারা আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের আনুগত্য করে তারা তাঁদের সঙ্গে থাকবে যাঁদের আল্লাহ তাআলা নিয়ামত দান করেছেন, তাঁরা হলেন নবী, শহীদ ও সালিহগণ, আর তাঁরা কতইনা উত্তম সঙ্গী।’
উক্ত আয়াতে ওলায়তের স্তর যেরূপ সাব্যস্ত আছে সে আলোকে তাঁদের বন্ধুত্ব ও ভালোবাসার সৌন্দর্য প্রকাশিত হয়।
এখানে এ বিষয়টি পরিষ্কার যে, আল্লাহর বিশেষ বান্দাগণের সঙ্গে থাকা এক বড় নিয়ামত। আল্লাহর আনুগত্য ও রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর অনুসরণের মধ্যেই যার ভিত্তি। আল্লাহর নৈকট্য, যার প্রত্যাশা প্রত্যেক দীনদারের অন্তরে রয়েছে, তা অর্জনের সর্বোত্তম ও সঠিক পথ হলো, উক্ত চার দলের মধ্যকার কোনো এক দলের সঙ্গী হওয়া। কেননা সঠিক গন্তব্যে পৌঁছার জন্য সফরের সঙ্গী বা গাইড দরকার। আরবী একটি প্রবাদ আছে,  الرفيق ثم الطريقআগে সঙ্গী খোঁজ, পরে রাস্তায় (সফরে) বের হও।
ہیچ چیز خود بخود چیزے نشد
ہیچ آہن خود بخود تیغے نشد
مولوی ہرگز نشد مولائے روم
تا غلام شمس تبریزے نشد
-কোনো বস্তু নিজে নিজে  বস্তুতে পরিণত হয় না
কোনো লোহা নিজে নিজে তলোয়ার হয় না
মৌলভী কখনো মাওলায়ে রূম হয় না
যতক্ষণ না শামসে তাবরীযীর গোলাম হয়।

যাই হোক, এখানে ওলীর পরিচয় ও স্তর আলোচনা করা উদ্দেশ্য। ওলায়ত দুই প্রকার। যথা :
১. ওলায়তে সুগরা
২. ওলায়তে কুবরা।
ওলায়তে সুগরা
‘নাফহাতুল উন্স’ গ্রন্থে আলিমে রাব্বানী, আরিফে কামিল হযরত মাওলানা আবদুর রাহমান জামী (র.) বর্ণনা করেছেন যে, ওলায়ত দুই প্রকার। এক প্রকার হলো ওলায়তে সুগরা, যা ঈমান আনয়নের মাধ্যমে অর্জিত হয়। কুরআনে আযীমে আছে :
الله وَلِيُّ الَّذِينَ آمَنُوا يُخْرِجُهُمْ مِنَ الظُّلُمَاتِ إِلَى النُّورِ-
-‘আল্লাহ তাআলা হলেন মুমিনগণের বন্ধু। তিনি তাদের অন্ধকার থেকে আলোর দিকে বের করে আনেন।’

ওলায়তে কুবরা
দ্বিতীয় প্রকার ওলায়ত হলো ওলায়তে কুবরা, যা বিশেষ বান্দাগণকে প্রদান করা হয়। তাকওয়া, পবিত্রতা, ইবাদত, রিয়াযত, মুজাহাদার সাথে সাথে এ স্তরের বান্দাগণের রূহানী লাতাফত এতই বেড়ে যায় যে, তাদের ইনকিশাফাত (দিব্যদৃষ্টি) সাধারণত সঠিকই হয়। হাদীস শরীফে এটাকে ‘বুশরা’ বা সুসংবাদ ও  ‘রু’য়া সালিহাহ’ বা উত্তম স্বপ্ন নামে আখ্যায়িত করা হয়েছে।

মুকাশাফা, মুরাকাবা ও মুজাহাদা
কোনো কোনো সময় পূর্বোক্ত ইনকিশাফ এতই  উন্নতি লাভ করে যে, এর জন্য ঘুমানোরও কোনো প্রয়োজন হয় না। সাহাবায়ে কিরামের বর্ণনায় কোনো কোনো স্থানে আছে- بين النوم واليقظة ‘ঘুম ও জাগ্রত অবস্থার মাঝামাঝি’। এটাকে ‘মুকাশাফা’ বলা হয়। এ কারণে সত্যপন্থি সুফিয়ায়ে কিরামের মধ্যে মুরাকাবার নিয়ম জারি রয়েছে। মুরাকাবা হলো অন্তরকে  দুনিয়া থেকে সরিয়ে এ বিষয়ের অপেক্ষা করা যে, আল্লাহ জাল্লা জালালুহুকে তাঁর দয়ার দৃষ্টিতে দেখে নিবে এবং তাঁর নূর ও তাজাল্লিসমূহের বর্ষণ শুরু হবে। মুরাকাবার জন্য মুজাহাদা জরুরী। মুজাহাদা হলো রিয়াযত করা। রিয়াযত এর অর্থ অহেতুক কষ্ট সহ্য করা নয় বরং সত্যপন্থি, নেককার ও পবিত্র শরীআতের পাবন্দ মুরশিদে কামিলের তা’লীম ও তালকীন অনুযায়ী আমল করার নামই রিয়াযত।